ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মুক্তেশ্বরী নদী এখন মরা খাল

অভয়নগর (যশোর) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৩, ২০২৫, ০৭:৩৯ এএম

*** কচুরিপানা, অপরিকল্পিত স্থাপনা ও নানা প্রতিবন্ধকতায় বন্ধ হয়ে গেছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ

একসময়ের প্রবাহমান মুক্তেশ^রী নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে মরা খালে পরিণত হয়েছে। যশোর শহর ও ভবদহ এলাকার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনের অন্যতম ভরসাস্থল এই নদীটি পলি জমে ভরাট হয়ে পড়েছে। তার ওপর কচুরিপানা, অপরিকল্পিত স্থাপনা ও নানা প্রতিবন্ধকতায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে খালে পরিণত হয়ে নদীটির হারিয়ে গেছে স্রোত ও প্রাণ। 

জানা যায়, মুক্তেশ^রী নদী ভৈরব নদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। যশোরের চৌগাছা বাজার থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার উত্তরে পীতবের বাঁকের দক্ষিণ পাশ থেকে এর উৎপত্তি। এরপর যশোর বিমানবন্দরসংলগ্ন বাদিয়ান্তলা ও লতাপুল হয়ে মণিরামপুর উপজেলার আশিমগঞ্জ, ছাকুরিয়া, হরিদাসকাটি ও লতিফপুর ইউনিয়নের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে অভয়নগরের পায়রা ইউনিয়নের বারা-া গ্রামে গিয়ে টেকা নদীতে মিশেছে। এক সময় এই নদী ছিল ভাটির প্রাণ। ছিল ঘোষের ভাটা, টাউসহ নানা প্রজাতির মাছের আধার এবং ছোটবড় পালতোলা নৌকার ব্যস্ত চলাচল। নদী দিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বিস্তীর্ণ এলাকার জমির পানি নিষ্কাশন হতো।

মুক্তেশ^রী নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য জেলে পরিবার। একসময় যেখানে প্রতিদিন ধরা পড়ত নানা জাতের দেশি-বিদেশি মাছ, সেখানে এখন কেবল কচুরিপানা আর দুর্গন্ধ। স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০১৬ সালের পর থেকে নদীতে মাছ ধরা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, বন্ধ হয়েছে মাছ চাষও। দূষিত পানির কারণে এলাকাবাসী চর্ম রোগ, খাদ্যজনিত সমস্যা ও শ^াসকষ্টসহ নানা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ভুগছে।

স্থানীয়রা জানান, সড়ক, বাড়িঘর, গেস্ট হাউসসহ বিভিন্ন অবৈধ দখলের কারণে নদীর স্বাভাবিক ধারা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। নদীর বুকজুড়ে পলি জমে চর সৃষ্টি হয়েছে। পচে যাওয়া কচুরিপানার দুর্গন্ধে নদীপাড়ের মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

শিক্ষক সমিতাব বিশ^াস বলেন, ‘২০১৬ সালের আগে নদীতে ১০-১৫ হাত পানি থাকত। গ্রীষ্মকালে গোসল করা না গেলেও পানির অভাব ছিল না। এখন অনেক জায়গায় হাঁটু পরিমাণ পানিও নেই।’

স্থানীয়দের মতে, ১৯৬২ সালে ভবদহ এলাকায় ২১টি ডবল স্লুইসগেট নির্মাণের পর থেকেই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়ে টিআরডি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুক্তেশ^রী নদী প্রায় সম্পূর্ণ প্রাণহীন অবস্থায় পৌঁছেছে।

যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ ব্যাপারী বলেন, ‘মুক্তেশ^রী নদীর পুরো অংশ কচুরিপানায় ভরে গেছে। বড় প্রকল্পের কাজে ব্যস্ত থাকায় দীর্ঘদিন এ নদীর দিকে পর্যাপ্ত নজর দেওয়া সম্ভব হয়নি।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ড্রেজিং কার্যক্রম, স্লুইসগেট ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, নদী দখলমুক্ত করা এবং কচুরিপানা অপসারণ ছাড়া মুক্তেশ^রী নদীকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব নয়। ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষি উৎপাদন রক্ষা এবং জেলে পরিবারগুলোর জীবন-জীবিকা ফিরিয়ে আনতে মুক্তেশ^রী নদীর পুনঃগঠন এখন সময়ের দাবি।