ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

যশোরের অভয়নগর

কয়লার আগুনে পুড়ছে প্রকৃতি

অভয়নগর (যশোর) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৪, ২০২৫, ০২:০১ এএম

কিছুকাল আগেও যশোরের অভয়নগরের সকাল শুর” হতো সবুজ গাছের ফাঁক দিয়ে আসা সূর্যের আলো আর পাখির ডাক দিয়ে। অথচ আজ সেই দৃশ্য শুধু স্মৃতি হয়ে গেছে। ভোর হলেই চারপাশ ঢেকে যায় কয়লার কালো ধোঁয়ায়। কুয়াশা নয়Ñ এ ধোঁয়া পোড়া কাঠের, পোড়া জীবনের। ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস কেড়ে নেওয়া এক নীরব হত্যাযজ্ঞ যেন চলছে অভয়নগর উপজেলাজুড়ে।

উপজেলার সিদ্ধিপাশা ইউনিয়নের আমতলা ও সোনাতলা গ্রামে ঢুকলেই চোখে পড়ে ধোঁয়ার স্তূপ। সড়কের পাশে, ফসলি জমিতে বসতবাড়ির কাছেই গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক অবৈধ কয়লার চুল্লি। দিনের পর দিন এসব চুল্লিতে পুড়ছে আম, জাম, কাঁঠাল, বাবলা ও বিভিন্ন বনজ গাছ। যে গাছগুলো একসময় এই জনপদকে ছায়া দিত, অক্সিজেন জোগাতÑ সেগুলোই এখন কালো কয়লায় রূপ নিয়ে বাতাসে বিষ ছড়াচ্ছে। চুল্লির ধোঁয়া শুধু আকাশ কালো করছে না, কালো করে দিচ্ছে মানুষের জীবনও। এতে একদিকে উজাড় হচ্ছে গাছ, অন্যদিকে ধোঁয়া ও দূষণে মারাত্মক বিপপর্যায়ে পড়ছে পরিবেশ।

স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আশপাশে গেলে শোনা যায় একই অভিযোগÑ শিশুদের শ্বাসকষ্ট, বয়স্কদের হাঁপানি, চোখ জ্বালাপোড়া, বুক ধড়ফড়, দীর্ঘস্থায়ী কাশি।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়, কিছু অসাধু প্রশাসনিক কর্মকর্তার মদদে এই অবৈধ ব্যবসা চলছে। স্থানীয় কয়েকজন চুল্লি মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নিয়মিত ঘুষ দিয়ে তারা ব্যবসা চালাচ্ছেন। এমনকি বিভিন্ন মহলকে মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়া হয় যাতে তাদের বির”দ্ধে কেউ মুখ না খোলে। তা ছাড়া চুল্লির অধিকাংশ মালিক এলাকায় সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত। তাদের ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলোÑ এই ধ্বংসযজ্ঞ নতুন নয়। ২০২৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর উপজেলা প্রশাসন ও জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে আদালতের নির্দেশে ১৩টি অবৈধ কয়লার চুল্লি ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। সেদিন এলাকাবাসী ভেবেছিল, কালো ধোঁয়ার রাজত্বের অবসান হলো। কিন্তু সেই আশার আয়ু ছিল খুবই স্বল্প। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে পুরোনো জায়গায় আবারও জ্বলে ওঠে চুল্লির আগুন। যেন আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই চলছে সব কিছু।

জানা গেছে, গত বছরের ৫ আগস্টের পর সিদ্দিপাশায় নতুন করে গড়ে উঠে আরও ৫০-এর অধিক চুল্লি। নাউলির ওয়াপদা থেকে মজুদখালী ত্রিমোহনা পর্যন্ত অধিকাংশ চুল্লি গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া নতুন হাট, কাজীপাড়ায় রয়েছে চুল্লি। নদীপথে গেলে দেখা যায়, চুল্লির আগুন ও ধোয়া এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

এদিকে, এলাকাবাসী চুল্লি বন্ধের জন্য প্রশাসন বরাবর মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দিলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা হতাশ। তাদের অভিযোগ, প্রশাসন নীরব থাকায় চুল্লি মালিকরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে নওয়াপাড়া পৌর এলাকায় কয়লা ডাম্পিং নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আবাসিক এলাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে কয়লা মজুত ও পরিবহনের ফলে ধুলো ও ধোঁয়ার মাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থী, নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়লেও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষোভ জমছে জনমনে।

আমতলা এলাকার বৃদ্ধা শুকুর আলী বলেন, ‘রাতে ঘুমাতে পারি না, ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসে। জানালা খুললেও ধোঁয়া, বন্ধ করলেও ধোঁয়া।’

স্থানীয় কয়েকজন চুল্লি মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিয়মিত ঘুষ দিয়ে তারা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি বিভিন্ন মহলকে মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়া হয়, যাতে তাদের বির”দ্ধে কেউ মুখ না খোলে। তা ছাড়া চুল্লির অধিকাংশ মালিক এই এলাকার সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত। তাদের ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না।

এ বিষয়ে অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালাউদ্দীন দিপু বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। খুব শিগগিরই চুল্লি ভেঙে দিয়ে মালিকদের বির”দ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ যশোরের পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. এমদাদুল হক বলেন, এ বিষয়ে দ্র”ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।