বরগুনা জেলার নলটোনা ইউনিয়নের আজগরকাঠী গ্রামে অবৈধ কাঠের চুল্লিতে কয়লা উৎপাদন এখন ভয়াবহ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশখালী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা একাধিক চুুল্লি থেকে প্রতিনিয়ত নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ায় আশপাশের জনপদ কার্যত দমবন্ধ অবস্থায় রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব চুল্লির কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র বা প্রশাসনিক অনুমোদন নেই। তবুও প্রকাশ্যে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা উৎপাদন চললেও কার্যকর নজরদারি না থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। দিনের পর দিন ধোঁয়ার সংস্পর্শে থেকে শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের মধ্যে শ^াসকষ্ট, মাথা ঘোরা, বমি, চোখ জ্বালাপোড়া ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও ধোঁয়ার হাত থেকে রক্ষা মিলছে না, বিশেষ করে রাতে চুল্লির মুখ খুলে দিলে ঘুমানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আজগরকাঠী গ্রামের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম সবুজ বলেন, অবৈধ চুল্লির কারণে ঘরে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। ছোট সন্তানদের নিয়ে বাঁচাই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বারবার প্রশাসনের কাছে গেলেও স্থায়ী কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। গৃহবধূ শিরিন আক্তার ময়না বলেন, খাবার খেতে বসলে ধোঁয়ার গন্ধে বমি আসে, রাতে ঘুমানো যায় না। অভিযোগ করলেই হুমকি দেওয়া হয়, তাই সবাই ভয় পাচ্ছে।
স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ী আবুল কালাম জানান, ধোঁয়ার প্রভাবে ফসল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিশুরা পড়াশোনা করতে পারছে না, পুরো এলাকার পরিবেশ ধ্বংসের পথে। তিনি আরও বলেন, চুুল্লির বিরুদ্ধে মুখ খুললেই মালিকপক্ষের লোকজন ভয়ভীতি দেখায়, এমনকি মারধরের আশঙ্কাও থাকে।
অন্যদিকে, চুল্লিতে কর্মরত শ্রমিকরা বলছেন, এই কাজই তাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। শ্রমিক সোবহান খান জানান, দৈনিক প্রায় এক হাজার টাকা আয় করে পরিবার চালান তারা। চুল্লি বন্ধ হলে তাদের পরিবার চরম সংকটে পড়বে। এতে একদিকে কর্মসংস্থান, অন্যদিকে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
চুল্লির মালিক কবির মৃধা স্বীকার করেন, তাদের কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। তবে তিনি দাবি করেন, সরকারি সহায়তা পেলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবেশের ক্ষতি কমানো সম্ভব। আরেক মালিক মাসুদ ফিটার বলেন, বড় শিল্পকারখানায় দূষণ হলেও ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোতেই বারবার অভিযান হয়।
এ বিষয়ে বরগুনা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আবদুল আলীম জানান, বাবুগঞ্জ ফাঁড়ির ইনচার্জকে সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করে অবৈধ চুল্লি বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বরগুনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) অনিমেষ বিশ^াস বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অবৈধ চুল্লির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পরিবেশ আইন অনুযায়ী অনুমোদনহীনভাবে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা উৎপাদন দ-নীয় অপরাধ হলেও বাস্তবে তার কার্যকর প্রয়োগ খুব কমই দেখা যায়। একদিকে কর্মসংস্থানের যুক্তি, অন্যদিকে মানুষের জীবন ও পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন, এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আজগরকাঠীসহ আশপাশের জনপদ স্থায়ী পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন