ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

যশোর-২ আসন

ভোট দিতে প্রস্তুত কৃষক-শ্রমিকেরা

চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬, ০৬:১৬ এএম

বসন্তের আগমনী হাওয়ায় যশোরের দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠগুলো এখন সবুজ-শ্যামল। বোরো ধান ও রবিশস্যের খেত পরিচর্যায় কৃষকের দম ফেলার ফুরসত নেই। কিন্তু এবারের ব্যস্ততা অন্য সব বছরের চেয়ে আলাদা। হাড়ভাঙা খাটুনির মাঝেও ঘামভেজা কপালে এখন হাসির ঝিলিক, কারণ দীর্ঘ ১৭ বছর পর তারা ফিরে পেয়েছেন নিজেদের ভোটাধিকার।

আজ (বৃহস্পতিবার) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যশোর-২ (চৌগাছা-ঝিকরগাছা) আসনের এই নির্বাচনি আবহে দুই উপজেলার কৃষক ও শ্রমিকের মাঝে ভোট দেওয়ার প্রস্তুতিটা বেশ চোখে পড়ার মতো। মাঠে মাঠে কাজের ফাঁকে ফাঁকে জটলা পাকিয়ে সাধারণ ভোট ও গণভোট নিয়ে চলছে আলোচনা। সেই সঙ্গে প্রতিটি খেত-খামারে কৃষক আর শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে চলছে ভোট দেওয়ার প্রস্তুতি।

ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা গ্রামের ফুল শ্রমিক ফুলমতি বেগম (৪০) বলেন, ‘ভোট দেওয়া তো আমাদের হক। গত কয়েকবার কেন্দ্রে গিয়েও ফিরে এসেছি, ভোট দিতে পারিনি। এবার শুনছি খুব কড়াকড়ি, পরিবেশও ভালো। তাই কালকের (আজ) জন্য বন্ধ রেখেছি। সকাল সকাল লাইনে দাঁড়াব, নিজের ভোটটা নিজে দিয়ে তবেই বাড়ি ফিরব।’

উপজেলার পাতিবিলা, ধুলিয়ানী ও স্বরূপদাহ ইউনিয়নের মাঠগুলোতে সরেজমিনে দেখা যায় এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। কাস্তে হাতে বোরো ধানের খেত নিড়ানি দিতে দিতে কৃষকদের আলোচনার প্রধান বিষয় এখনÑ কে হচ্ছেন তাদের আগামীর কান্ডারি।

পাতিবিলা গ্রামের মাঠে নিজ খেতে কাজ করছিলেন কৃষক শরিফুল (৪৭), শ্রমিক নিছার উদ্দেন (৩২) ও মহিদুল ইসলাম (২৬)। প্রতিদিনের মতো আজকেও তারা মাঠে নেমেছেন, তবে আজ কাজ শেষে তাদের প্রস্তুতিটা ভিন্ন। শরিফুল বলেন, ‘বাপু, গত কয়েকটা ভোটে কেন্দ্রে গিয়েও ভোট দিতে পারিনি। এবার শুনছি, পরিবেশ ভালো। তাই ঠিক করেছি, কাল সকালে আগে ভোট দিয়ে আসব, তারপর অন্য কাজ।’

পাশ থেকে শ্রমিক নিছার উদ্দিন বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, ভোট দিয়ে কী হবে জানি না, তবে নিজের ভোটটা নিজে দিতে পারাটাই এখন বড় আনন্দ। গৃহস্থকে বলে দিয়েছি, ভোটের দিন কোনো কাজ হবে না।’

সরূপদাহ ইউনিয়নের ভোটার ভ্যানচালক রফিকুল ইসলাম (৩৫) বলেন, ‘সারা দিন ভ্যান চালিয়ে যা পাই, তা দিয়ে সংসার চলে না। জিনিসপত্রের যে দাম, তাতে নাভিশ্বাস উঠছে। প্রার্থীরা তো অনেক বড় বড় কথা বলে, কিন্তু ভোটের পর কেউ আমাদের মনে রাখে না। এবার দেখেশুনে ভোট দেব, যে আমাদের পেটের খবরের পাশাপাশি মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেবে।’

এই অঞ্চলে কৃষিশ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৫০০-৬০০ টাকা এক দিনের মজুরি হারানো মানে সংসার চালানোয় টান পড়া। কিন্তু এবার সেই লোকসানকে তুচ্ছ জ্ঞান করছেন তারা।

কৃষকদের এই প্রস্তুতির পেছনে রয়েছে অনেক পাওয়া-না পাওয়ার বেদনা। সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এমন একজন প্রতিনিধি চান, যিনি তাদের কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করবেন। বিশেষ করে শীতকালীন সবজির ভান্ডার হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে একটি আধুনিক হিমাগার স্থাপন এবং বিএডিসি বীজের সহজলভ্যতা তাদের প্রধান দাবি। এ ছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত নিরাপদ জনপদ গড়ার অঙ্গীকার শুনতে চান তারা।

যশোর-২ আসনের পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে লড়াইয়ের মূল কেন্দ্রে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী সাবিরা নাজমুল মুন্নি ও জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে সব ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের স্পৃহা।

চৌগাছা সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘গণতন্ত্রের আসল ভিত্তি হলো প্রান্তিক মানুষের অংশগ্রহণ। এবার কৃষক-শ্রমিকদের মধ্যে যে জাগরণ দেখা যাচ্ছে, তা কেবল একজন প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য নয়, বরং নিজের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের লড়াই।’