কাপ্তাই হ্রদের পানি সময়মতো না কমায় রাঙামাটির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বোরো মৌসুমের ধান চাষসহ কৃষি আবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হ্রদ তীরবর্তী উপজেলার নি¤œাঞ্চলগুলো এখনো পানির নিচে তলিয়ে থাকায় হাজারো কৃষক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে পানি না কমানো হলে চলতি মৌসুমে বোরো ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বহুগুণ কমে যেতে পারে।
সরেজমিনে উপজেলার বিলাই বাজার, কেরনছড়ি, ধূপ্যাচর, দীঘলছড়ি, কুতুবদিয়া, মাছকাবা ছড়া, শুকনা ছড়া, সাক্রাছড়ি, বহলতলী ও ভালাছড়ি এলাকায় দেখা যায়, হ্রদের উঁচু অংশের সামান্য কিছু জমিতে ধান রোপণ করা সম্ভব হলেও অধিকাংশ জমি এখনো জলমগ্ন। কৃষকরা জানান, মাঠজুড়ে বীজতলা ও চারা (জালা) রোপণের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও জমি আবাদযোগ্য না হওয়ায় তারা হাত গুটিয়ে বসে আছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কৃষক আক্ষেপ করে বলেন, গত বছর এই সময়ে পানি অনেক নিচে নেমে গিয়েছিল। তারা জানতেন, জাতীয় নির্বাচনের সময় নৌ-যোগাযোগ সচল রাখতে হ্রদের পানি কিছুটা ধরে রাখা হয়েছিল। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর পানি দ্রুত কমানোর আশ^াস দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। কৃষকদের প্রশ্নÑ ‘ফেব্রুয়ারির মধ্যে পানি না কমলে চাষ করা সম্ভব নয়। জুনের বর্ষায় আবার পানি বেড়ে গেলে পুরো মৌসুমই হাতছাড়া হয়ে যাবে। এই বিশাল আর্থিক ক্ষতির দায় কে নেবে?’
বিলাইছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজেশ প্রসাদ রায় জানান, চলতি মৌসুমে এই অঞ্চলে ২৮০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বজায় থাকলে এবং পানি দ্রুত না কমলে বড়জোর ৭৫ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ সম্ভব হতে পারে। এতে একটি বিশাল উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হওয়ার সরাসরি ঝুঁকি রয়েছে।
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. জাফর আহাম্মদ বলেন, ‘কাপ্তাই হ্রদের জলেভাসা জমিতে কৃষকরা বছরে মাত্র একবার চাষের সুযোগ পান। সঠিক সময়ে পানি না কমলে বীজতলা নষ্ট হয়ে যায়, যা কৃষকদের মেরুদ- ভেঙে দেবে। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবেÑ তাই নির্দিষ্ট সময়ে পানি কমানো ও বাড়ানো নিশ্চিত করা জরুরি।’
সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক শান্তি বিজয় চাকমা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, অন্তত নৌচলাচলের ন্যূনতম উচ্চতা বজায় রেখে বাকি পানি দ্রুত কমিয়ে ফেলা উচিত, যাতে চাষযোগ্য জমিগুলো কৃষকদের ব্যবহারের উপযোগী হয়।
এ বিষয়ে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান জানান, বর্তমানে হ্রদে পানির উচ্চতা ৯৩ ফুট এমএসএল। আগে একটি গেট খোলা থাকলেও বর্তমানে দুটি গেট দিয়ে পানি ছাড়া হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, কাপ্তাই বাঁধের কারণে রাঙামাটির প্রায় ৫৪ হাজার একর জমি স্থায়ীভাবে পানির নিচে রয়েছে, তাই পানি ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য রক্ষা করা একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া।
ভুক্তভোগী কৃষকরা বিষয়টি সুদৃষ্টিতে দেখার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ানের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের প্রত্যাশা, সরকার দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিলে বোরো মৌসুমের সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়ানো এবং কৃষকদের স্বপ্ন রক্ষা করা সম্ভব হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন