রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার বাঙ্গালহালিয়া ইউনিয়নের কুদুমছড়া গ্রাম। সবুজ পাহাড়ে ঘেরা এই শান্ত জনপদেই গড়ে উঠেছে এক সম্ভাবনাময় গবাদিপশুর খামার। পাহাড়ি তরুণ উদ্যোক্তা আছোমং মারমা নিজের অদম্য পরিশ্রম আর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি ছোট উদ্যোগকে আজ লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়েছেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
২০১৮ সালে মাত্র তিনটি গরু দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন আছোমং মারমা। তখন পর্যাপ্ত পুঁজি বা আধুনিক অবকাঠামোÑ কোনোটিই তার ছিল না। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পশুখাদ্য সংগ্রহ ও চিকিৎসাসেবা পাওয়া ছিল অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। অনেকেই তখন তাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু হাল না ছেড়ে ইউটিউব এবং অভিজ্ঞ খামারিদের পরামর্শে জ্ঞান অর্জন করে নিজের সঞ্চয় ও স্বজনদের সহায়তায় এগিয়ে যান তিনি।
২০২০ সালে প্রায় ১১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ১৩টি গরু কেনেন আছোমং। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে তার খামারে গরুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮টিতে, যার বাজারমূল্য প্রায় অর্ধকোটি টাকা। পাশাপাশি তিনি বাণিজ্যিকভাবে শূকর পালনও করছেন। প্রায় ২৫ শতাংশ জমির ওপর গড়ে তোলা এই খামারে এখন আলাদা শেড, খাবার সংরক্ষণের স্থান এবং সুপেয় পানির ব্যবস্থা রয়েছে।
খামারটিতে বর্তমানে পাঁচজন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন। প্রতিদিন গরুর সুষম খাদ্য প্রস্তুত, ভ্যাকসিন প্রয়োগ এবং শেড পরিষ্কারের মতো কাজগুলো তারা তদারকি করেন। বর্তমানে এই খামার থেকে আছোমং মারমার বার্ষিক আয় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা। এ ছাড়া খামারের গোবর স্থানীয় কৃষকদের কাছে জৈব সার হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে, যা পরিবেশবান্ধব কৃষিতে সহায়তা করছে।
জানতে চাইলে আছোমং মারমা বলেন, ‘প্রতিটি গরুকে নিজের সন্তানের মতো যতœ নিয়েছি। এখন যখন দেখি অন্যদের কর্মসংস্থান হচ্ছে, তখন খুব ভালো লাগে।’ ভবিষ্যতে তিনি খামারটিকে আরও আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচালনা করতে চান। সরকারের পক্ষ থেকে সহজশর্তে ঋণ ও কারিগরি প্রশিক্ষণ পেলে আরও বড় পরিসরে কাজ করার স্বপ্ন দেখেন এই সফল উদ্যোক্তা।
স্থানীয়রা জানান, এ খামার শুধু মাংসের চাহিদা পূরণ করছে না, বরং এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। পাঁচজন শ্রমিকের নিয়মিত আয় নিশ্চিত হয়েছে। এ ছাড়া পশুখাদ্য সরবরাহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িত আরও কয়েকজন পরোক্ষভাবে উপকৃত হচ্ছেন।
উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা প্রিয়রতন চাকমা জানান, বর্তমান সময়ে আত্মকর্মসংস্থানই তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। সরকারি চাকরির সীমাবদ্ধতার কারণে যুবকদের বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে হবে। আছোমং মারমার মতো উদ্যোক্তারা প্রমাণ করেছেনÑ সাহস, পরিকল্পনা ও অধ্যবসায় থাকলে পাহাড়ি এলাকাতেও সফল হওয়া যায়। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর তরুণদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও সহজ ঋণ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি করতে কাজ করছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. মো. নোমান বলেন, পাহাড়ি এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে গবাদিপশু পালন সম্ভাবনাময় খাত। সঠিক পরিচর্যা, নিয়মিত টিকাদান ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করলে খামারিরা ভালো লাভবান হতে পারেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সবসময় খামারিদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন