ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বগুড়ার দুপচাঁচিয়া

জ্বালানি ব্যয়ে অচল শিল্পাঞ্চল

উজ্জ্বল চক্রবর্ত্তী শিশির, দুপচাঁচিয়া
প্রকাশিত: মার্চ ৫, ২০২৬, ০৫:৫৫ এএম

বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার তালোড়া বন্দরের ঐতিহ্যবাহী অ্যালুমিনিয়াম শিল্প জ্বালানি ও গ্যাস সংকটে বন্ধের পথে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় গত চার বছরে ১১টির মধ্যে ১০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস সংযোগ না পেলে চলমান একমাত্র কারখানাটিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

তালোড়া বন্দর উপজেলা সদর থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে এবং রেল ও নদীপথে যোগাযোগ সুবিধাসম্পন্ন। ১৯৫৪ সালে এখানে মেসার্স খেতওয়াত অ্যালুমিনিয়াম ওয়ার্কস প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে চাহিদা বাড়ায় ছোট-বড় মিলিয়ে ১২টি কারখানা গড়ে ওঠে। এসব কারখানায় হাঁড়ি, পাতিল, গামলা, বালতি ও মগসহ বিভিন্ন তৈজসপত্র উৎপাদিত হয়ে বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, রংপুর, কুড়িগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হতো। পাঁচশতাধিক শ্রমিক এখানে কাজ করতেন।

কারখানাগুলোতে ভাঙারি ও বিভিন্ন ধাতব পদার্থ গলাতে ফার্নেস অয়েল, বার্নিং অয়েল ও খড়ি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ফার্নেস অয়েলের দাম প্রতিবছর লিটারপ্রতি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা করে বাড়ছে। এতে এক কেজি পণ্য উৎপাদনে জ্বালানি খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১৬ টাকা। অন্যদিকে গ্যাস ব্যবহার করলে একই পরিমাণ পণ্য উৎপাদনে খরচ হয় মাত্র ৬ থেকে ৯ টাকা।

বগুড়া শহরে গ্যাস সংযোগ থাকায় সেখানে উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম। তালোড়া থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে গ্যাস সুবিধা থাকলেও এখানে এখনো সংযোগ দেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

প্রগতি অ্যালুমিনিয়ামের মালিক নূরে আলম চৌধুরী জানান, গ্যাসচালিত কারখানার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ছয় বছর আগে তার প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হয়েছে। বিনোদ পোদ্দার পবন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও গ্যাস সংযোগ না থাকায় প্রায় চার বছর আগে তার কারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে। এতে অর্ধশত শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।

ব্যবসায়ী গৌরী শংকর জানান, গ্যাস সংযোগপ্রাপ্ত কারখানায় নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য উৎপাদনে যেখানে এক লাখ টাকা খরচ হয়, সেখানে তাদের পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। উৎপাদন ব্যয়ের এই বৈষম্যে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হয়নি।

সৌরভ অ্যালুমিনিয়াম ওয়ার্কশপের স্বত্বাধিকারী সুভাষ প্রসাদ কানু বলেন, গ্যাস সংযোগ পেলে উৎপাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব। এক মাসের ফার্নেস অয়েলের খরচ দিয়ে ছয় থেকে সাত মাস গ্যাস কেনা যাবে। ২০০০ সালে বগুড়ায় গ্যাস সংযোগ দেওয়ার সময় তালোড়ার ব্যবসায়ীরা জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

কারখানার শ্রমিক আরিফুল ইসলাম বলেন, একমাত্র সচল কারখানাটিও বন্ধ হলে কয়েকশ শ্রমিকের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। প্রবীণ ব্যক্তি আলহাজ্ব আরফান আলী ও ব্যবসায়ী মদনলাল গুপ্তের মতে, গ্যাস সরবরাহ, সড়ক উন্নয়ন ও রেললাইন সংস্কার হলে তালোড়ার অ্যালুমিনিয়াম শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে গ্যাস সংযোগের বিষয়ে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে তালোড়ার ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।