ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

অস্তিত্বসংকটে জিয়া খাল পুনর্খননের উদ্যোগ

মো. জামাল হোসেন, বেনাপোল
প্রকাশিত: মার্চ ১৫, ২০২৬, ০৭:০৪ এএম

যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশী-যদুনাথপুর এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘জিয়া খাল’ এখন প্রায় অস্তিত্বের সংকটে। একসময় হাজারো কৃষকের মুখে হাসি ফোটানো এবং এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনা এই খাল দীর্ঘদিন অবহেলা ও দখলের কারণে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। তবে অবশেষে খালটি পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশীতে হেলিকপ্টারে এসে নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে খাল খনন কর্মসূচির সূচনা করেন। সেদিন তিনি প্রায় ১৬ মাইল পথ হেঁটে সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে খাল খননের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন। তার আহ্বানে হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে কোদাল-ঝুড়ি নিয়ে খাল খননের কাজে অংশ নেন। সে সময় প্রকল্পটি ‘উলাশী-যদুনাথপুর বেতনা নদী সংযোগ প্রকল্প’ নামেও পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে এটি স্থানীয়ভাবে ‘জিয়া খাল’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

এই খাল দিয়ে উত্তর শার্শার সোনামুখী ও বনমান্দারসহ ২২টি বিলের হাজার হাজার একর জমির পানি নিষ্কাশন হতো। পাশাপাশি শার্শা উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ১৭২টি গ্রামের কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে খালটি। খালের পানি সেচের কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় কৃষিতে উৎপাদন বাড়ে এবং জলাবদ্ধতা কমে যায়।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল বারিক মন্ডল জানান, খাল খননের সময় জিয়াউর রহমান নিজ হাতে বিসমিল্লাহ বলে মাটি কেটে তাদের মাথায় তুলে দেন। খালটি খননের ফলে তখন অনাবাদি জমিতে ফসল উৎপাদন সম্ভব হয় এবং কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়। তবে দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালটি এখন মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় মৎস্যজীবী শহীরাম রাজবংশী বলেন, একসময় এই খালে জাল ফেললেই পুঁটি, শোলসহ নানা দেশি মাছ পাওয়া যেত। জেলে সম্প্রদায়ের অনেক পরিবার এই খালের মাছের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করত। এখন খালে পানি না থাকায় সেই মাছও প্রায় বিলুপ্ত।

সরেজমিনে দেখা গেছে, খালের পাড়ের অনেক জমির মালিক বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করছেন। ফলে খালের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ খাল খননের সময় জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে জমি সরকারি খাতায় নেওয়া হয়েছিল বলে স্থানীয়রা জানান।

খাল খনন কর্মসূচি চলাকালে জিয়াউর রহমান খালের পাড়ে একটি সাধারণ ভবনে রাত যাপন করেছিলেন। পরে ওই ভবন সরকারি কর্মকর্তাদের বৈঠক ও কৃষকদের মিলনমেলার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এখন ভবনটি পরিত্যক্ত। ভবনের ভেতরে থাকা জিয়ার ব্যবহৃত খাট, টেবিল, চেয়ার, ফ্যানসহ বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্নও হারিয়ে গেছে। একইভাবে খালের পাশে নির্মিত ঐতিহাসিক ‘জিয়া মঞ্চ’ও এখন বিলুপ্তির পথে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, সম্প্রতি যশোর জেলার গুরুত্বপূর্ণ ২০টি মৃতপ্রায় খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শার্শা উপজেলার চার কিলোমিটার দীর্ঘ উলাশী খাল, ৪ দশমিক ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ আমলাই-সেতাই খাল এবং পাকশিয়া খালের তিন কিলোমিটার অংশ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য ব্যয় নিরূপণ করে তালিকা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

পাউবো যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, স্থানীয় জনগণের অসচেতনতা ও দখলদারিত্বের কারণেই অনেক খাল হারিয়ে যাচ্ছে। নদী ও খাল দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা এখানে একটি বড় সমস্যা। তিনি জানান, আগামী ১ এপ্রিল উলাশী খাল খননের মধ্য দিয়ে যশোরের মৃতপ্রায় খালগুলো পুনঃখননের কার্যক্রম শুরু হবে। এ জন্য স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় প্রায় ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়রা মনে করছেন, খালটি পুনঃখনন করা হলে আবারও সেচের সুবিধা বাড়বে, কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং মৎস্য সম্পদও পুনরুদ্ধার হতে পারে। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক এই খাল ও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলো সংরক্ষণের দাবিও জানিয়েছেন তারা।