রাজশাহীর তানোর উপজেলার বিল কুমারী বিলজুড়ে এখন সবুজ-সোনালির সমারোহ। দিগন্তজোড়া ধানের শীষে ভরপুর এই বিল যেন হাজারো কৃষকের স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। উত্তরের হিমেল বাতাসে দুলছে পাকা ধান, আর সেই সঙ্গে আশায় বুক বাঁধছেন কৃষকরা।
বিলে বর্তমানে পানি নেই, চারদিকে শুধু সবুজ ও সোনালি ধানের সমারোহ। আর সপ্তাহখানেকের মধ্যেই শুরু হবে বোরো ধান কাটা। তবে আনন্দের মাঝেও রয়েছে দুশ্চিন্তা- তাপপ্রবাহ, ঝড়ের আশঙ্কা এবং ধানের কম দামের চাপ।
ভূমিহীন কৃষক ফারুক জানান, বিলের নিচু জমিতে ২২ কাঠা জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। ধান ভালো হয়েছে, তবে কাটতে আরও প্রায় ২০ দিন লাগবে। রোপণ থেকে কাটা পর্যন্ত খরচ হবে প্রায় ১৬-১৭ হাজার টাকা।
ডাকবাংলো মাঠ সংলগ্ন ধানতৈড় মৌজার কৃষক ও ড্রেনম্যান শাকির মুনসুরসহ অন্যরা জানান, এ বছর বিলে রোগবালাই কম হওয়ায় সার ও কীটনাশকের খরচ কম হয়েছে। আবহাওয়াও ছিল অনুকূলে, সেচ ও বিদ্যুতেরও তেমন সমস্যা হয়নি। ফলে প্রতি বিঘায় ২৫ থেকে ৩০ মণ পর্যন্ত ফলনের আশা করছেন তারা। শাকির জানান, তার সাড়ে তিন বিঘা জমিতে বোরো চাষ হয়েছে এবং এক সপ্তাহের মধ্যেই ধান কাটা শুরু হবে। এ ছাড়া বকুল (৭ বিঘা), মোনায়েম (৩ বিঘা), হালিম (আড়াই বিঘা), মান্নান (৮ বিঘা), হাকিম (৩ বিঘা), সাহেব (৩ বিঘা), শাওন (৬ বিঘা), বিমল (৩ বিঘা) ও অধির (১০ বিঘা) জমিতে বোরো চাষ করেছেন।
কৃষকরা জানান, নিজস্ব জমিতে প্রতি বিঘায় খরচ ১৬-১৭ হাজার টাকা এবং লিজের জমিতে ২২-২৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। ভালো ফলন হলে নিজস্ব জমিতে বিঘাপ্রতি ১০-১১ হাজার টাকা এবং লিজের জমিতে ৪-৫ হাজার টাকা লাভ হতে পারে। তবে আবহাওয়া প্রতিকূল হলে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে, ধানের বাজারদর নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, ধানের দাম মণপ্রতি ৪০০-৫০০ টাকা কমে গেছে। পরিবহন সংকট ও বাড়তি ভাড়ার কারণে বাইরের ব্যবসায়ীরা আসতে পারছেন না। ফলে ধান বিক্রি কমে গেছে।
কৃষকদের দাবি, সব কিছুর দাম বাড়লেও ধান ও আলুর দাম কমছে। ন্যায্যমূল্য না পেলে ভবিষ্যতে চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন তারা। উপজেলার চান্দুড়িয়া ব্রিজঘাট থেকে কামারগাঁ ইউনিয়নের চৌবাড়িয়া ব্রিজ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় আগাম বোরো চাষ হয়েছে। এসব এলাকার অধিকাংশ জমিতে বছরে একটি ফসলই উৎপাদন হয়, তবে ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকরা আশাবাদী।
তানোর পৌরসভার বিএস আকবর আলী জানান, এ বছর ধানে রোগবালাই কম থাকায় কৃষকদের খরচ কম হয়েছে এবং ফলন ভালো হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
কৃষি বিজ্ঞানী নুর মোহাম্মদ বলেন, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ফলন ভালো হয়েছে। তবে বৈশাখী ঝড়ের আশঙ্কা সবসময় থাকে। তিনি ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানান, উপজেলায় এবার ১৪ হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক কাজ করায় উৎপাদন ভালো হয়েছে।
অন্যদিকে, বিলে পানি না থাকায় বিপাকে পড়েছেন মৎস্যজীবীরা। বিলের মূল অংশ প্রায় ২ হেক্টর অভয়াশ্রম থাকলেও পানিশূন্যতার কারণে মাছ নেই বললেই চলে।
মৎস্যজীবী রফিকুল ইসলাম বিসু, আফজাল, সবুর ও আজিমুল আজিজুরসহ অনেকে জানান, প্রায় দেড় মাস ধরে তারা বিলে মাছ পাচ্ছেন না। ফলে ঋণ নিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে। অনেকে এনজিওর কিস্তির চাপে এলাকা ছাড়তেও বাধ্য হয়েছেন। তাদের দাবি, প্রকৃত মৎস্যজীবীদের জন্য সরকারি সহায়তা এখন সময়ের দাবি।

