ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বোরো ধানে লোকসানে চাষিরা, খড়েই এখন শেষ ভরসা

তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মে ১১, ২০২৬, ০৬:৩৬ এএম

রাজশাহীর তানোরে মাঠজুড়ে সোনালি ধানের সমারোহ থাকলেও কৃষকের মুখে হাসির বদলে এখন দুশ্চিন্তার ছাপ। ধান কাটা-মাড়াই প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও লাভের অঙ্ক মেলাতে পারছেন না বোরো চাষিরা। অস্বাভাবিক উৎপাদন খরচ আর বাজারে ধানের নায্যমূল্য না থাকায় কৃষকের কাছে এখন ধান নয়, বরং গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত ‘খড়’ হয়ে উঠেছে টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন।

উপজেলার রফিকুল ইসলাম, আল মামুন ও সাইদুর রহমানের মতো প্রান্তিক চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে এক বিঘা জমিতে ধান চাষে খরচ হচ্ছে ২০ থেকে ২৩ হাজার টাকা। আর যদি জমি বর্গা নেওয়া হয়, তাহলে সেই খরচ ২৫ থেকে ২৭ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে স্থানীয় বাজারে ধান বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা মণ।

চাষিদের মতে, এক বিঘায় গড়ে ২২-২৫ মণ ধান উৎপাদন হলেও প্রতি মণের উৎপাদন খরচ পড়ছে প্রায় ১ হাজার ২২০ টাকা। ফলে প্রতি বিঘা ধানে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষিদের।

ধানে বড় অঙ্কের লোকসান হলেও চাষিরা বলছেন, খড় বিক্রি করে সেই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা।

বোরোচাষি মুনসুর জানান, বিঘায় ৩-৪ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। খড়ের দাম ভালো থাকলে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেত। আগে প্রতি কাউন খড় ৫-৬ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও সাম্প্রতিক ঝড়-বৃষ্টিতে খড় ভিজে যাওয়ায় এখন তা ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। তবু ধানের চেয়ে খড়টাই এখন আমাদের টিকে থাকার লড়াইয়ের সম্বল।

চলতি মৌসুমে ধানের ফলন ভালো হলেও সঠিক সময়ে শ্রমিক না পাওয়া এবং দ্বিগুণ মজুরি (৮০০-১২০০ টাকা) চাষিদের দিশাহারা করে তুলেছে। এর ওপর গত কয়েক দিনের আকস্মিক ঝড়-বৃষ্টিতে কাটা ধান ও শুকনো খড় ভিজে যাওয়ায় অনেক চাষির স্বপ্ন ধুলোয় মিশেছে। ভেজা খড় পচে যাওয়ার ভয়ে পানির দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী অঞ্চলের চার জেলায় এবার ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৫ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলেও কৃষকের আর্থিক সংকট প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে।

এদিকে সংরক্ষণের সুবিধা না থাকায় এবং ঋণের বোঝা শোধ করার চাপে অধিকাংশ ক্ষুদ্র চাষি ধান কাটার পরপরই তা বিক্রি করে দিচ্ছেন। চাষি আল মামুন বলেন, সংসারের খরচ আর দেনা মেটাতে ১ হাজার ১০০ টাকা দরেই ধান বিক্রি করতে হয়েছে। বাড়িতে গরু আছে বলেই খড়গুলো কাজে লাগবে, না হলে পথে বসতে হতো।

কৃষকদের দাবি, ধানের সরকারি ক্রয়মূল্য বৃদ্ধি এবং সরাসরি প্রান্তিক কৃষকদের থেকে ধান সংগ্রহ করা না হলে আগামীতে ধান চাষে আগ্রহ হারাবেন উত্তরের এই জনপদের মানুষ।