× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মঞ্জুরুল ইসলাম ও হাসান মাহমুদ

প্রকাশিত: মে ১৮, ২০২৬, ০৬:৩৬ এএম

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ই-সিগারেটের থাবা

মঞ্জুরুল ইসলাম ও হাসান মাহমুদ

প্রকাশিত: মে ১৮, ২০২৬, ০৬:৩৬ এএম

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ই-সিগারেটের থাবা

ময়মনসিংহের নান্দাইলে আশঙ্কাজনকভাবে ই-সিগারেট বা ‘ভেপ’-এ আসক্ত হয়ে পড়ছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। ক্ষতিকর এই ইলেকট্রনিক ডিভাইসের নেশায় বুঁদ হয়ে ক্লাসে মনোযোগ হারাচ্ছে শিশুরা, বিঘিœত হচ্ছে স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ। সম্প্রতি নান্দাইল উপজেলা মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভায় এই ভয়াবহ চিত্র উঠে আসার পর স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, সম্প্রতি নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)ফাতেমা জান্নাতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আসে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত হয়ে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কুশল রনি বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ে চুরির ঘটনা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি চামারুল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একাংশ এক ধরনের নতুন মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ার তথ্য জানান। এই ঘটনা শুনে সভায় উপস্থিত সবাই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

চামারুল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) রতœা খানম একজন শিক্ষার্থীর উদাহরণ দিয়ে এই আসক্তির ভয়াবহতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ছেলেটি অত্যন্ত মেধাবী ছিল। প্রতিদিন সবার আগে বিদ্যালয়ে এসে প্রথম বেঞ্চে বসত। পড়ালেখায় ওর এত আগ্রহ ছিল যে, ছুটির পর শিক্ষকেরা ওকে অগ্রিম কাজ বুঝিয়ে দিতেন। ওকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু হঠাৎই ছন্দপতন ঘটে। গত কয়েক মাস ধরে ছেলেটি ভীষণ আনমনা হয়ে যায়। কারো সঙ্গে কথা বলে না, প্রথম বেঞ্চ ছেড়ে পেছনের বেঞ্চে বসে এবং সারাক্ষণ টেবিলে মাথা রেখে ঘুমায়। ওর চকচকে চেহারাটাও মলিন হয়ে গেছে।

পরে খোঁজ নিয়ে শিক্ষকরা জানতে পারেন, ওই শিক্ষার্থী ‘ভেপ’ বা ই-সিগারেটে মারাত্মকভাবে আসক্ত। বিদ্যালয়ের বাইরে অন্য একজনের সহায়তায় সে এই ডিভাইস ব্যবহার করত। প্রধান শিক্ষক জানান, এটি কেবল একটি শিশুর গল্প নয়, বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই এই প্রবণতা দেখা গেছে।

রতœা খানম আরও জানান, কয়েক মাস আগে কিছু শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয় চত্বরেই ধোঁয়া ওড়াতে দেখে কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত ১৫ দিন আগে বিদ্যালয়ে একটি জরুরি অভিভাবক সমাবেশ ও সচেতনতা সভার আয়োজন করা হয়।

ওই সভায় উপস্থিত অনেক অভিভাবক অকপটে স্বীকার করেন যে, জিনিসটিকে ক্ষতিকর কিছু না ভেবে স্রেফ ‘ডিজিটাল খেলনা’ মনে করে সন্তানের আবদার মেটাতে তারা তা কিনে দিয়েছেন। তবে এটি যে আসলে এক ধরনের ভয়ংকর মাদক, তা তারা জানতেন না। পরে ইন্টারনেট থেকে ভেপিংয়ের কুফল সংগ্রহ করে বড় প্রজেক্টরে সচিত্র দেখানোর পর অভিভাবকরা সচেতন হন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাশর্^বর্তী ঈশ^রগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বড় বাজার ‘রায়ের বাজার’-এর বেশকিছু দোকানে এই ডিভাইস অবাধে বিক্রি হচ্ছে। সেখান থেকেই শিশুরা বা তাদের পরিচিতরা এটি কিনে আনছে।

বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক আসক্ত শিক্ষার্থী জানায়, তার বাড়ির পাশে এক ব্যক্তিকে এই ডিভাইস ব্যবহার করতে দেখে সে আকৃষ্ট হয়। প্রথমে ৫ বা ১০ টাকা দিয়ে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে সে ‘সুখটান’ দিত। পরবর্তী সময়ে জেদ ধরলে তার বাবা প্রায় এক হাজার ৫০০ টাকা খরচ করে তাকে এই ডিভাইস কিনে দেন। শিক্ষার্থীটি বলে, ডিভাইসটি পাওয়ার পর থেকে আমি নিয়মিত টানতে থাকি। কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই শরীর দুর্বল লাগে, খাওয়ার রুচি চলে গেছে, পড়তে ভালো লাগে না। শুধু ঝিমুনি আসে আর সারাক্ষণ ওই যন্ত্রটা টানতে ইচ্ছা করে।

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, ই-সিগারেট বা ভেপ কোনো নিরাপদ বিকল্প নয়। এটি ব্যবহারে মস্তিষ্কে ডোপামিনের নিঃসরণ বাড়ে, যা সাময়িক প্রশান্তি দিলেও দ্রুত আসক্তি তৈরি করে। এর তরল মিশ্রণ গরম হয়ে উৎপাদিত ফরমালডিহাইড শরীরের রক্ত সঞ্চালন ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং এর উচ্চমাত্রার নিকোটিন ফুসফুস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া ই-সিগারেটের শক্তিশালী ব্যাটারি বিস্ফোরণে ব্যবহারকারীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে, যারা ই-সিগারেট ব্যবহার করে, পরবর্তীতে তাদের সাধারণ সিগারেটে আসক্ত হওয়ার আশঙ্কা সাধারণ মানুষের চেয়ে তিন গুণ বেশি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির সভাপতি ও ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক বলেন, বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচ মারাত্মক আসক্তি তৈরি করে তরুণ প্রজন্মের ফুসফুস, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়। এমনকি এই ডিভাইসে মাদক ব্যবহারের নজিরও মিলছে। কিন্তু তামাক কোম্পানিগুলো ‘কম ক্ষতিকর’ বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় মূলত দেশের শিশু, কিশোর ও তরুণদের টার্গেট করছে। ই-সিগারেটের চটকদার ফ্লেভার ও আধুনিক ডিজাইনের কারণে এই কোমলমতি বয়সেই তাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ভারত, সিঙ্গাপুরসহ ৪১টি দেশ এটি নিষিদ্ধ করেছে। আমাদেরও এখনই শক্তিশালী আইনের মাধ্যমে কিশোর-তরুণদের রক্ষায় এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার সবচেয়ে বড় সুযোগ।

তামাকবিরোধী গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মী সুশান্ত সিনহা এ প্রসঙ্গে বলেন, বিশ্বব্যাপী ই-সিগারেট তামাকজাত দ্রব্য হিসেবে বিবেচিত হলেও আমাদের দেশে তামাকজাত দ্রব্যের সংজ্ঞা থেকে এটিকে বাদ দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে। একই সঙ্গে বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকপণ্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধের বিদ্যমান ধারাটিও বাতিলের চেষ্টা করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। ২০০৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখা হয়েছিল। অথচ বর্তমানে কেন এই সুরক্ষামূলক ধারা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।

তিনি সতর্ক করে বলেন, এই আইনি ধারাগুলো যদি তামাক কোম্পানির প্ররোচনায় বাতিল বা শিথিল করা হয়, তবে সবদিক থেকেই আমাদের কোমলমতি শিশু ও তরুণ প্রজন্মকে নিশ্চিত ধ্বংসের পথে ঠেলে দেওয়া হবে।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!