টিনের চাল থেকে যেন আগুন ঝরছে, পিচঢালা রাস্তা থেকে উঠছে তপ্ত ভাপ। ক্যালেন্ডারের পাতায় বর্ষা প্রায় চলে এলেও বৃষ্টির দেখা নেই। তীব্র ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস করছে জনজীবন। বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে পড়ছে মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে তৃষ্ণা মেটাতে ও সাময়িক স্বস্তি পেতে অনেকেরই ভরসা হয়ে উঠেছে এক গ্লাস ঠান্ডা লেবুর শরবত।
উপজেলার বিভিন্ন বাজার, বাসস্ট্যান্ড, ফুটপাত ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এখন শরবত বিক্রেতাদের ব্যস্ত সময় কাটছে। প্রচ- গরম থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে সব বয়সি মানুষ ভিড় করছে শরবতের দোকানগুলোতে। এক গ্লাস লেবুর শরবত বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ টাকায় আর কমলালেবুর শরবতের দাম ২০ থেকে ২৫ টাকা।
দুপুরের প্রখর রোদে তৃষ্ণার্ত পথচারীদের কাছে বরফকুচির ঝনঝন শব্দ যেন স্বস্তির বার্তা হয়ে আসে। বিক্রেতারাও হাত খোলার ফুরসত পাচ্ছেন না। বরফ, পানি, কমলার জুস, চিনি, বিট লবণ এবং কাগজি বা এলাচি লেবুর রস মিশিয়ে মুহূর্তেই তৈরি করা হচ্ছে জনপ্রিয় এই পানীয়। কোনো কোনো দোকানে বাড়তি স্বাদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে পুদিনা পাতা, চাট মসলা, তোকমা দানা কিংবা ইসবগুলের ভুসি।
সিও অফিস বাসস্ট্যান্ড এলাকার শরবত বিক্রেতা সোহেল রানা বলেন, অন্য সময় দিনে ৫০ থেকে ৬০ গ্লাস শরবত বিক্রি করাই কঠিন হতো। এখন দুপুর গড়ানোর আগেই ১০০ থেকে ১৫০ গ্লাস বিক্রি হয়ে যায়। মানুষ গরমে অস্থির হয়ে এসে এক নিঃশ্বাসে শরবত খেয়ে ফেলছে।
প্রচ- গরমে শরবতের চাহিদা বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় কাঁচাবাজারেও। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন পণ্যের তালিকায় রয়েছে লেবু। কয়েক দিনের ব্যবধানে লেবুর দামও বেড়েছে। তবে দাম কিছুটা বাড়লেও ক্রেতাদের মধ্যে তেমন অসন্তোষ নেই। কারণ কৃত্রিম কোমল পানীয়ের তুলনায় প্রাকৃতিক লেবুর শরবতকে তারা বেশি স্বাস্থ্যকর ও সতেজতাদায়ক মনে করছেন।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, কাগজি ও এলাচি লেবুর চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। আকারভেদে প্রতি হালি কাগজি লেবু ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেকেই পরিবারের জন্য বেশি পরিমাণে লেবু কিনে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন শরবত তৈরির উদ্দেশ্যে।
লেবুর শরবতের উপকারিতা সম্পর্কে চিকিৎসক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে পানি ও প্রয়োজনীয় খনিজ লবণ বের হয়ে যায়। লেবুর শরবত সেই ঘাটতি দ্রুত পূরণে সহায়তা করে। লেবুতে থাকা পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম শরীরে লবণের ভারসাম্য রক্ষা করে। পাশাপাশি এটি ক্লান্তি দূর করে তাৎক্ষণিক শক্তি জোগায় এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতেও সহায়ক। ভারি বা তৈলাক্ত খাবার খাওয়ার পরও লেবুর শরবত হজমে স্বস্তি এনে দেয়।
তবে চাহিদা বাড়ার সুযোগে অনেক ক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে শরবত বিক্রির ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। দূষিত পানি বা অপরিচ্ছন্ন বরফ ব্যবহারের কারণে ডায়রিয়া ও পেটের বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই শরবত তৈরিতে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্যসচেতন ব্যক্তিরা।
উপজেলা কৃষি অফিসের উপসহকারী সেলিম প্রাং জানান, বাইরের খোলা শরবত এড়িয়ে চলতে তিনি অফিসে যাওয়ার সময় ব্যাগে লেবু ও লবণ সঙ্গে রাখেন। প্রয়োজন হলে কর্মস্থলেই নিজে শরবত তৈরি করে পান করেন।
ভ্যাপসা গরমে ক্লান্ত মানুষের কাছে এক গ্লাস ঠান্ডা লেবুর শরবত এখন শুধু তৃষ্ণা নিবারণের পানীয় নয়, বরং সাময়িক স্বস্তি এবং প্রশান্তিরও প্রতীক। আকাশে স্বস্তির বৃষ্টি না নামা পর্যন্ত তপ্ত জনজীবনের সঙ্গী হয়ে থাকবে এই সহজলভ্য ও স্বাস্থ্যকর পানীয়।

