বন উজাড়, খাদ্য সংকট এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান অনুপ্রবেশের কারণে বন্যপ্রাণীরা তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারিয়ে লোকালয়ের দিকে চলে আসছে। ফলে মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সংঘাতের ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি হুমকির মুখে পড়ছে দেশের জীববৈচিত্র্যও।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় গত এক মাসে লোকালয় থেকে ১৪টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। পরিবেশবিদদের মতে, এই সংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং বনাঞ্চলের সংকট ও জীববৈচিত্র্যের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের একটি উদ্বেগজনক চিত্র।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল জানান, চলতি বছরের ৩ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৪টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত প্রাণীর মধ্যে রয়েছে অজগর, পদ্ম গোখরা, তক্ষক, বনবিড়াল, চিতাবিড়াল, জঙ্গল প্যাঁচা, সবুজ ফনিমনসা এবং বিপন্ন লজ্জাবতী বানরসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় মানুষের বসতবাড়ি, দোকান কিংবা বাগানে এসব প্রাণী ঢুকে পড়ে। খবর পেয়ে আমরা সেখানে গিয়ে উদ্ধার করি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রাণীগুলো ক্লান্ত, আহত বা অসুস্থ অবস্থায় থাকে। চিকিৎসা ও পরিচর্যার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলার পর বন বিভাগের সহযোগিতায় তাদের আবার প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করা হয়।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এবং আশপাশের বনাঞ্চল ছিল বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। কিন্তু বনভূমি উজাড়, অপরিকল্পিত রিসোর্ট নির্মাণ, কৃষিজমির সম্প্রসারণ এবং মানুষের অবাধ বিচরণের কারণে বনাঞ্চল সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটে প্রাণীরা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে চলে আসছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, খাদ্যের সন্ধান কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে লোকালয়ে প্রবেশ করা প্রাণীগুলোর অনেকই সড়ক দুর্ঘটনা, বৈদ্যুতিক ফাঁদ কিংবা মানুষের আক্রমণের শিকার হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন প্রাণহানি বাড়ছে, অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়ছে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকা থেকে মোট ৬৭টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছিল। চলতি বছরের উদ্ধার তৎপরতার ধারা বলছে, বনের প্রাণীদের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
স্বপন দেব সজল বলেন, ‘নির্বিচারে গাছ কাটা, ঝোপঝাড় পরিষ্কার, বনভূমিতে মানুষের অনুপ্রবেশ, কৃষিকাজের সম্প্রসারণ এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের কারণে বন্যপ্রাণীদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। খাদ্য ও আবাস সংকটে তারা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে চলে আসছে।’ তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘লোকালয়ে কোনো বন্যপ্রাণী দেখা গেলে আতঙ্কিত হয়ে তাকে আঘাত করবেন না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। নিরাপদে উদ্ধার করে প্রাণীগুলোকে আবার বনে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, ‘প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি প্রাণীরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বন ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে অনেক প্রজাতিই হারিয়ে যেতে পারে। বন্যপ্রাণী উদ্ধার কার্যক্রম শুধু প্রাণ রক্ষা নয়, জনসচেতনতা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’
পরিবেশবাদীদের মতে, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষা, বনভূমি সংরক্ষণ এবং মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। অন্যথায় জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির পাশাপাশি পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রাও দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়বে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন