লাল লিচুর বর্ণিল মৌসুমে রঙিন হয়ে উঠেছে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা। গুণগত মান ও স্বাদের কারণে সারাদেশে সমাদৃত ঈশ্বরদীর লিচু এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় রেকর্ড পরিমাণ ফলন দিয়েছে। ফলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি উৎপাদনে খুশি চাষি ও ব্যবসায়ীরা, যদিও তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হওয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়াও রয়েছে।
উপজেলার জয়নগর বাজার ও আওতাপাড়া বাজারে প্রতিদিন ভোর ৪টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত কয়েক কোটি টাকা লিচু বিক্রি হচ্ছে। লিচু বেচাকেনায় ক্রেতা ও বিক্রেতাদের পদচারণায় মুখরিত হয় উঠেছে লিচুর হাট। বাজার থেকে লিচু কেনার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ব্যবসায়ীরা সরাসরি বাগান থেকেও লিচু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তবে চলমান তীব্র তাবদাহে গাছেই পুড়ে নষ্ট হচ্ছে অনেক লিচু। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা। চলতি মে মাসের শুরু থেকে হাটবাজারে লিচু বিক্রির মৌসুম শুরু হয়েছে। ব্যবসায়ী ও চাষিদের ধারণা, জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত চলবে এ মৌসুমের লিচু বেচাকেনা।
স্থানীয় কয়েকজন লিচুচাষির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার ছলিমপুর ইউনিয়নে প্রথম লিচুর আবাদ শুরু হয়। পরে তা দাশুড়িয়া, সাহাপুরসহ অন্যান্য ইউনিয়নে ছড়িয়ে পড়ে। মৌসুম থেকে মৌসুমে গাছের সংখ্যা ও উৎপাদন বাড়তে থাকে। একসময় লিচু চাষ বাণিজ্যিক রূপ নেয়, যা বর্তমানে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।
চাষিরা জানান, এখনো এলাকায় ৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সি অনেক লিচুগাছ রয়েছে। এসব গাছে আগের মতোই ফলন হয়। লিচুর প্রতি ভালোবাসা ও আবেগের কারণে লাভ-লোকসান যা-ই হোক না কেন, প্রতি মৌসুম শেষে নতুন মৌসুমের অপেক্ষায় থাকেন তারা।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার উপজেলায় ৩ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। লিচুবাগানের সংখ্যা ১২ হাজার ৩৬০টি। গাছ রয়েছে ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৫০০টি। প্রতিটি গাছে গড়ে ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার লিচু ধরে। ঈশ্বরদীতে মোজাফফর ও বোম্বাই জাতের লিচুর আবাদই বেশি।
গত ১০ দিন ধরে উপজেলার জয়নগর ও আওতাপাড়া বাজারে বোম্বাই জাতের লিচু প্রতি হাজার ১২০০ থেকে ২৮০০ টাকা দরে বেচাকেনা হচ্ছে। গত বছর যেখানে সর্বোচ্চ ভালোমানের লিচু প্রতি হাজার ৪৫০০-৫০০০ টাকা দরে বেচাকেনা হয়েছে। এবার সেই লিচু বিক্রি হচ্ছে প্রতি হাজার সর্বোচ্চ ২৮০০ টাকা। গতবারের তুলনায় দাম কম হলেও ফলন দ্বিগুণ-তিনগুণ হওয়ায় চাষিরা এ দামে লিচু বিক্রি করে খুশি।
চাষিরা জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর লিচুর ফলন বেশি হওয়ায় দাম কিছুটা কম। অন্য বছর যে গাছে ৩ হাজার লিচুর ফলন হয়েছিল এ বছর সেখানে কমপক্ষে ১০ হাজার লিচুর ফলন হয়েছে। লিচু এমন একটি ফল এটি পাকা শুরু করলে ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে গাছ থেকে সংগ্রহ করে বিক্রি করতে হয়। তা না হলে লিচুতে পচন ধরে যায়। ফলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে লিচু বিক্রির কারণে দাম কিছুটা কম পাওয়া যায়।
উপজেলার ছলিমপুর, সাহাপুর, পাকশী, দাশুড়িয়া, মুলাডুলি ও লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকায় রয়েছে শত শত লিচুবাগান। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাগান রয়েছে ছলিমপুর ও সাহাপুর ইউনিয়নে।
ফল ব্যবসায়ীরা জানান, পাকিস্তান আমল থেকেই ঈশ্বরদীতে লিচুর আবাদ শুরু হয়। তখন গাছের সংখ্যা ছিল খুবই কম। হাটবাজারও এত বিস্তৃত ছিল না। গরু কিংবা ঘোড়ার গাড়িতে করে লিচু এনে ঈশ্বরদী বাজারে বিক্রি করা হতো। সময়ের সঙ্গে উৎপাদন ও গাছের সংখ্যা বেড়েছে। মিষ্টি ও সুস্বাদু হওয়ায় ঈশ্বরদীর লিচু এখন সারা দেশে পরিচিত।
লিচুর মৌসুমে ছলিমপুরের শিমুলতলা ও সাহাপুরের আওতাপাড়া হাট হয়ে ওঠে প্রাণচঞ্চল। ফজরের নামাজের পর থেকেই লাখ লাখ লাল লিচুতে ভরে যায় দুই হাট। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আসা ব্যবসায়ীরা চাষিদের কাছ থেকে লিচু কিনে ট্রাকে করে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যান।
আওতাপাড়া হাটের ফল ব্যবসায়ী মেসার্স রনি ট্রেডার্সের মালিক ইন্তাজ আলী প্রামাণিক বলেন, পাকিস্তান আমল থেকেই এ অঞ্চলে লিচুর আবাদ শুরু হয়। ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়লেও স্বাধীনতার পর লিচুর বাণিজ্যিক বিক্রি শুরু হয়। তখন জনসংখ্যা কম ছিল, বাজারও ছিল সীমিত। ঘোড়ার গাড়িতে করে ঈশ্বরদী বাজারে লিচু এনে বিক্রি করা হতো। এখন ঈশ্বরদীর লিচু সারা দেশে সরবরাহ করা হয়।
তিনি বলেন, দেশি ও চায়না লিচুর পাশাপাশি সুস্বাদু বোম্বে লিচু বাজারে উঠতে শুরু করেছে। প্রতিদিন ভোর ৪টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। মাত্র আট ঘণ্টায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ লিচু বিক্রি হয়, যার বাজারমূল্য ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা। মধ্য জুন পর্যন্ত এ বেচাকেনা চলবে।
আওতাপাড়ার তুলনায় ছলিমপুরের শিমুলতলা হাটে আরও বেশি লিচুর আমদানি হয়। এ হাটের বাপ্পি ফল ভান্ডারের মালিক মো. আবুর আলী বলেন, গত ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে বেশি লিচুর উৎপাদন হয়েছে। প্রচুর সরবরাহ থাকায় দামও তুলনামূলক কম।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন