ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

কৃষক আমজাদের ফুটবল উন্মাদনা

বানালেন সাড়ে ৭ কিলোমিটার জার্মান পতাকা

মাগুরা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬, ০৬:৩৩ এএম

আজ (বৃহস্পতিবার) থেকে শুরু হচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপ। আর এই বিশ্বমঞ্চের উন্মাদনা সামনে রেখে আবারও দেশজুড়ে আলোচনায় এসেছেন মাগুরার চিরসবুজ ফুটবলপ্রেমী কৃষক আমজাদ হোসেন (৭০)। দীর্ঘ দুই দশকের ঐতিহ্য ধরে রেখে এবার তিনি তৈরি করেছেন সাড়ে সাত কিলোমিটার (৭.৫ কিমি) দীর্ঘ জার্মানির জাতীয় পতাকা।

গতকাল বুধবার সকালে মাগুরা সদর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিশাল পতাকা প্রদর্শন করা হয়। ব্যতিক্রমী এই আয়োজন দেখতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সুধীসমাজসহ শত শত উৎসুক ফুটবলপ্রেমী ভিড় জমান।

মাগুরা পৌরসভার ঘোড়ামারা গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ হোসেন পেশায় একজন সাধারণ কৃষক হলেও জার্মানি ফুটবল দলের প্রতি তার ভালোবাসা আকাশচুম্বী। ২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে তিনি প্রথম দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকা তৈরি করে সাড়া ফেলেছিলেন। এরপর ২০১০ সালে আড়াই কিলোমিটার, ২০১৪ সালে সাড়ে তিন কিলোমিটার এবং ২০১৮ সালে সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকা বানান তিনি। এবার সেই ধারাবাহিকতায় নতুন করে আরও দুই কিলোমিটার কাপড় যুক্ত করে পতাকার মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে সাড়ে সাত কিলোমিটারে।

পাঁচ ছেলে ও পাঁচ মেয়ের জনক আমজাদ হোসেন জানান, এবারের নতুন অংশটি তৈরি করতে তার প্রায় ৯০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে ৭০ হাজার টাকার কাপড় এবং বাকি টাকা পরিবহন ও দর্জি মজুরি বাবদ খরচ হয়। চারজন দর্জি টানা এক সপ্তাহ ধরে এটি সেলাই করেছেন।

তিনি বলেন, শুরুর দিকে পরিবারের অনেকেই এত টাকা খরচের বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু এবার আমার বড় ছেলে নিজেই খরচের টাকা দিয়েছে। জার্মানির প্রতি আমার এই ভালোবাসা কোনো বাধায় থামবে না।

ফুটবল ও দলের প্রতি আমজাদের এই ত্যাগ অবশ্য নতুন কিছু নয়। ২০১৪ সালে সাড়ে তিন কিলোমিটার পতাকা তৈরি এবং ওয়ান-ডে বা বিশ্বকাপের পর জার্মানির শিরোপা জয়ে গরু জবাই করে মেজবান খাওয়াতে গিয়ে নিজের প্রায় ২০ শতক জমি বিক্রি করতে হয়েছিল তাকে। সেবার তার খরচ হয়েছিল প্রায় ৫ লাখ টাকা। ২০১৮ সালেও পতাকা তৈরিতে জমি বিক্রি করে কয়েক লাখ টাকা খরচ করেন তিনি।

জার্মানি দলের প্রতি এমন অন্ধ ভালোবাসার পেছনে রয়েছে এক চমৎকার গল্প। আমজাদ জানান, ২০০৫ সালে তিনি মরণব্যাধি রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন। সে সময় জার্মানিতে তৈরি একটি হোমিওপ্যাথিক ওষুধ সেবন করে তিনি অলৌকিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন। সেই কৃতজ্ঞতা ও অনুরাগ থেকেই ২০০৬ বিশ্বকাপ থেকে নিয়মিত জার্মানির পতাকা বানিয়ে আসছেন তিনি।

আমজাদ হোসেনের আকুল আবেদন, এই পতাকা একদিন জার্মান দূতাবাসের মাধ্যমে যেন সংরক্ষণ করা হয়, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও জার্মানির প্রতি এক বাঙালি কৃষকের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখতে পারে।

প্রসঙ্গত, আমজাদ হোসেনের এই জার্মানিপ্রীতি আন্তর্জাতিক মহলেরও নজর কেড়েছে। ২০১৪ সালে তৎকালীন জার্মান রাষ্ট্রদূত নিজে মাগুরায় এসে আমজাদ হোসেনের তৈরি পতাকা উদ্বোধন করেন এবং তাকে জমকালো সংবর্ধনা দেন। একই সঙ্গে তিনি জার্মান ফুটবল দলের ফ্যান ক্লাবের আজীবন সদস্যপদ লাভ করেন।