পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় বোরো ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ। প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ধান না কিনে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। এতে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে ধান বিক্রির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় চাষিরা। নাজিরপুর উপজেলার শ্রীরামকাঠী খাদ্য গুদামে চলমান বোরো ধান সংগ্রহ কার্যক্রম নিয়ে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, ধান নিয়ে গুদামে গেলেও নানা অজুহাতে তাদের ধান গ্রহণ করা হচ্ছে না। কখন ধান জমা দেওয়া যাবে, সে বিষয়েও নির্দিষ্ট কোনো সময় জানানো হয় না। বাধ্য হয়ে অনেক কৃষক কম দামে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের যোগসাজশে এ অনিয়ম চলছে। সম্প্রতি সরকারি গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ না পেয়ে নাজিরপুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিক্ষোভ করেন কয়েকজন কৃষক।
কৃষকদের দাবি, ভালো মানের ধান নিয়েও গুদামে গেলে নানা অজুহাতে তা ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সরবরাহ করা ধান গ্রহণ করা হচ্ছে। সরেজমিনে গুদাম এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, গুদামের বাইরে বিপুল পরিমাণ ধানের বস্তা স্তূপ করে রাখা হয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, অন্য কৃষকরা যাতে ধান সরবরাহ করতে না পারেন, সে জন্য পরিকল্পিতভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া অনেক কৃষকের কৃষি কার্ড সংগ্রহ করে তা ব্যবহার করে ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ধান সরবরাহ করছেন বলেও অভিযোগ করেছেন কৃষকরা।
শ্রীরামকাঠী এলাকার কৃষক পরিতোষ হালদার বলেন, ‘৬ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি। ফলনও ভালো হয়েছে। এক বিঘা জমিতে ধান উৎপাদনে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু ধান বিক্রি করতে গেলে আমরা ন্যায্যমূল্য পাই না। সরকারি গুদামে ধান নিয়ে গেলে ভেজা, চিটা ধানসহ বিভিন্ন অজুহাত দেখানো হয়। অথচ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ধান ঠিকই নেওয়া হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এসব বিষয়ে কথা বললে বিভিন্ন ধরনের চাপের মধ্যে পড়তে হয়। তাই অনেক কৃষক নীরব থাকেন।’
নাজিরপুর উপজেলার দীর্ঘা ইউনিয়নের কৃষক শরিফুল বেপারী বলেন, ‘আমি ২৫ মণ ধান নিয়ে গুদামে গিয়েছিলাম। কিন্তু ১০২ নম্বর সিরিয়াল দেখিয়ে আমাকে ফেরত দেওয়া হয়। গুদামের সামনে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাজার হাজার বস্তা ধান রাখা হয়েছে। ফলে সাধারণ কৃষকদের ধান ঢোকানোর সুযোগ হচ্ছে না।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘সরকার নির্ধারিত দামে ধান বিক্রি করতে না পেরে বাধ্য হয়ে কম দামে বাইরে বিক্রি করতে হয়। অন্যদিকে দালাল ও প্রভাবশালীরা কৃষকদের কৃষি কার্ড ব্যবহার করে ধান সরবরাহ করছে।’ তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শ্রীরামকাঠী এলএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহিমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘সরকারি নিয়ম মেনেই কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। কেউ ধান নিয়ে এলে তাকে ফেরত দেওয়া হয় না। তবে বর্তমানে কিছু বস্তার সংকট থাকায় সাময়িক সমস্যা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গুদামের বাইরে কে কীভাবে ধান কেনাবেচা করছে, সেটা আমার দেখার বিষয় নয়। কৃষি কার্ড নিয়ে যে আসে, তার ধানই গ্রহণ করা হয়।’
খাদ্য গুদাম সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে নাজিরপুর উপজেলায় প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ বছর উপজেলায় ১ হাজার ৩০৬ টন বোরো ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।

