ঢাকা বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬

বাজারে আগেভাগেই এলো হাড়িভাঙা আম

রেজাউল করিম মানিক, রংপুর
প্রকাশিত: জুন ১৭, ২০২৬, ০৪:৩৯ এএম

উত্তরের স্বাদে ভিন্নতা ও সুমিষ্টতার জন্য খ্যাত জিআই পণ্য ‘হাড়িভাঙা’ আম এবার আগেভাগেই বাজারে এসেছে। মৌসুমের শুরুতেই এই আমকে ঘিরে রংপুরসহ উত্তরের বিভিন্ন জেলায় জমে উঠেছে বাণিজ্যিক কার্যক্রম। ক্রেতা, পাইকার ও ব্যবসায়ীদের উপচেপড়া ভিড়ে সরগরম হয়ে উঠেছে হাট-বাজারগুলো। প্রতি বছরের মতো এবারও জুনের ২০ তারিখের দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারজাত শুরুর কথা থাকলেও তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে চাষিরা আগেই বাগান থেকে আম সংগ্রহ শুরু করেছেন। এর ফলে বাজারে দ্রুত সরবরাহ বেড়েছে এবং বাণিজ্যিক লেনদেনও শুরু হয়েছে পুরোদমে। গত সোমবার মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জ এলাকায় একটি বাগান থেকে হাড়িভাঙা আম সংগ্রহের মধ্য দিয়ে মৌসুমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মো. রুহুল আমিন। এরপর থেকেই রংপুরের বিভিন্ন হাট-বাজার ও আড়তে আম কেনাবেচা বেড়ে যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, পদাগঞ্জ হাট ছাড়াও খোঁড়াগাছ, পাইকারহাট, ময়েনপুর, চ্যাংমারী, বালুয়া মাসুমপুর, কুতুবপুর, গোপালপুর, লোহানীপাড়া, রামনাথপুর ও কালুপাড়া এলাকায় আম বেচাকেনার ব্যস্ততা চলছে। এসব এলাকায় আমের মৌসুমকে ঘিরে এক ধরনের অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। চাষি, ফড়িয়া, পাইকার, অনলাইন বিক্রেতা ও পরিবহন ব্যবসায়ীরা সকলে এখন আম বাণিজ্যে ব্যস্ত সময় পার করছেন। অনেক বাগানে গাছে গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে হাড়িভাঙা আম, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি যোগ করেছে।

পদাগঞ্জ এলাকার আমচাষি মশিউর রহমান বলেন, ‘আমার ১০ একর জমির বাগানে এবার কিছুটা শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে ক্ষতি হয়েছে। তবে বাজারে ভালো দাম থাকায় ক্ষতি পুষিয়ে লাভের আশা করছি।’

স্থানীয় পাইকারি ব্যবসায়ী রাঙ্গা মিয়া জানান, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা আগেই যোগাযোগ শুরু করেছেন। এবার আমের দাম ও চাহিদা উভয়ই ভালো থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আমচাষি ও উদ্যোক্তা হানিফুর রহমান সজীব বলেন, ‘আবহাওয়া ভালো থাকার কারণে এবার আগেভাগেই আম বাজারে এসেছে। আকার ভেদে প্রতি মণ আম ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, হাড়িভাঙা আম স্বাদে অত্যন্ত সুস্বাদু এবং প্রতিটি আমের ওজন সাধারণত ১৫০-৫০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে গাছপাকা আম তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হলেও সংগ্রহের কয়েক দিনের মধ্যেই দ্রুত পেকে যাওয়ায় প্রতি মৌসুমে কিছু আম নষ্ট হয়।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও লালমনিরহাটÍএই পাঁচ জেলায় এ বছর প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমিতে হাড়িভাঙা আমের চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার মেট্রিক টন। প্রতি হেক্টরে গড়ে ১০ থেকে ১২ টন ফলন পাওয়া গেলে এবারের মৌসুমে ৩০০ কোটি টাকারও বেশি বাণিজ্য হতে পারে বলে চাষি ও ব্যবসায়ীরা আশা করছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের আম ৩০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। গ্যাপ (এঅচ) অনুসরণ করে রপ্তানি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।’

রংপুরের জেলা প্রশাসক মো. রুহুল আমীন বলেন, ‘হাড়িভাঙা আমকে জেলা প্রশাসনের অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। রপ্তানি বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক সংস্কার ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হবে।’ বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘হাড়িভাঙা আমের উৎপাদন বাড়াতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এতে কৃষকেরা আরও লাভবান হবেন।’

কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মতে, হাড়িভাঙা আম ইতোমধ্যে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। একসময় অভাব-অনটনে থাকা অনেক কৃষক এখন আম চাষের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছেন, যা এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে।