বরিশালে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে লোডশেডিং। গত এক সপ্তাহ ধরে নগরজুড়ে ঘনঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুৎ বিভাগ রোটেশন পদ্ধতিতে প্রায় প্রতি ঘণ্টায় লোডশেডিং দিচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, জেনারেশন ঘাটতির কারণে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের আইসিইউ ওয়ার্ডে। গুরুত্বপূর্ণ এই ইউনিটেও বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসাসেবা চলাকালে বিদ্যুৎ না থাকায় স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় হাতপাখা, মোমবাতি ও মোবাইলের আলোই ভরসা হয়ে দাঁড়ায়।
এদিকে নগরবাসী অন্ধকারে থাকলেও গভীর রাত পর্যন্ত জিলা স্কুলসংলগ্ন পরেশসাগর মাঠে বাণিজ্যমেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে।
বরিশাল জেলা (দক্ষিণ) বিএনপির সদস্যসচিব আবুল কালাম শাহিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি লেখেন, ‘আগামী ২ জুলাই এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে। বিদ্যুতের অভাবে পরীক্ষার্থীদের লেখাপড়া খুবই বিঘিœত হচ্ছে। কিন্তু বাণিজ্যমেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বহাল আছে। বিদ্যুৎ বিভাগ কি বলবেন?’
নগরবাসী জানান, বুধবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মাত্র ১২ ঘণ্টায় অন্তত ১০ থেকে ১২ বার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করেছে। এতে বাসাবাড়ির পাশাপাশি অফিস-আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
শহরের একাধিক চাকরিজীবী জানান, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় নির্ধারিত সময়ে অফিসের কাজ শেষ করা যাচ্ছে না। অনলাইনভিত্তিক কাজ, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ব্যাপক সমস্যা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখে পড়েছে শেবাচিম হাসপাতাল। রোগীর স্বজনরা জানান, আইসিইউর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে বিদ্যুৎ চলে গেলে রোগীদের নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। অথচ হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটে স্থায়ী বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, গত ১০ বছরে হাসপাতালটিতে কয়েক’শ কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও আইসিইউর জন্য আলাদা জেনারেটরের ব্যবস্থা করা হয়নি। বিষয়ে জানতে শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, উৎপাদন ঘাটতির কারণেই মূলত এ সংকট তৈরি হয়েছে। বরিশাল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুল কুমার স্বর্ণকার জানান, তার আওতাধীন বরিশাল শহরের একাংশ ও ঝালকাঠি এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ৯০ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫০ মেগাওয়াট। শুধু নগরের একাংশের বিদ্যুতের চাহিদাই প্রায় ৬৫ মেগাওয়াট। তিনি বলেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
বরিশাল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সুব্রত মালাকার জানান, নগরের উত্তর অংশে বিদ্যুতের চাহিদা ৪২ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ২২ মেগাওয়াট। কোনো একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি ধারণা করছেন। পাওয়ার গ্রিডের বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আক্তারুজ্জামান পলাশ বলেন, জেনারেশন ঘাটতির কারণে বরিশালে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ লোডশেডিং হচ্ছে। তবে এই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বরিশাল বিভাগ উন্নয়ন ও স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির সহ-সভাপতি আব্দুর রশিদ নিলু বলেন, এতটা ভয়াবহ লোডশেডিং কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিদ্যুৎ সরবরাহে সমবণ্টন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে শেবাচিম হাসপাতালের আইসিইউতে বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
এদিকে শেবাচিম হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে গত ১৬ জুন এ তথ্য জানানো হয়।
জহির উদ্দিন স্বপন জানান, জুলাই মাসে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসাসেবা উন্নয়নে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, শেবাচিম হাসপাতালকে এমনভাবে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানী ঢাকা বা অন্য কোথাও যেতে বাধ্য না হন।

