যে ঘরগুলোতে থাকার কথা ছিল হাসি-কান্নার গল্প সেই ঘরগুলো এখন ফাঁকা পড়ে আছে। বর্তমানে দরজায় তালা ঝুলছে। ঘরগুলো তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে, চারপাশে জমেছে ঝোপঝাড় আর শুকনো পাতার স্তূপ। সূর্য ডুবলেই এলাকাটি রূপ নেয় মাদকসেবী ও মাদককারবারিদের আড্ডাখানায়।
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার জিনারী ইউনিয়নের চর জিনারীতে গড়ে তোলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের গুচ্ছগ্রাম এখন জনশূন্য। প্রায় ৫০ শতক খাসজমিতে নির্মিত ২৫টি ঘরে একসময় দরিদ্র পরিবারগুলো বসবাস শুরু করলেও এখন সেখানে কোনো পরিবারই নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূমিহীনদের জন্য গ্রহণ করা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো নির্মাণের সময় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অনিয়মের মধ্যে ঘরগুলো নির্মিত হলেও বরাদ্দে রাজনৈতিক প্রভাব বেশি থাকায় প্রকৃত ভূমিহীন অনেক পরিবার বঞ্চিত হয়েছে। আবার বসবাসের জন্য যেসব পরিবার উঠেছিল, তারাও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে চলে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২১ সালে উপহার হিসেবে গুচ্ছগ্রামের ২৫টি আধাপাকা ঘর নির্মাণ করা হয়। পরে ঘরগুলো সুবিধাভোগীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব, নিরাপত্তাহীনতা এবং সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির কারণে ধীরে ধীরে সব পরিবার সরে যায়। বর্তমানে ঘরগুলো তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে, চারপাশে জমেছে ঝোপঝাড় আর শুকনো পাতার স্তূপ।
ঘরগুলো বরাদ্দপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেনÑ শ্যামলাল গুর, ছালাম, শহর আলী, রশিদ মিয়া, বশির উদ্দিন, সন্ধ্যারাণী, রোকেয়া, মাসুদ মিয়া, ফরজুল মিয়া, দিলু মিয়া, নয়ন মিয়া, হানিফা, রাহেলা, খুশি, জোৎসনা, জালাল মিয়া, হামিদ মিয়া, ছাহেলা, রাশিদ, মাহমুদা, হোসনা নাহার, গেসু মিয়া, কপিল মিয়া, শাহজাহান মিয়া ও আছিয়া আক্তার।
গুচ্ছগ্রামটির সভাপতি শ্যামলাল গুর জানান, প্রথমে ১৪টি পরিবার সেখানে বসবাস শুরু করেছিল। কিন্তু প্রতিশ্রুতির সুযোগ-সুবিধার কোনোটি মেলেনি। ভোটার আইডি সংগ্রহ করা হয়েছিল অনেক কিছু দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। বাস্তবে আমরা শুধু বছরে দুবার ঈদে ৮ কেজি করে চাল পেয়েছি। রাস্তা করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও চার বছরেও হয়নি। তাই নিরাপত্তাহীনতা ও যাতায়াত সমস্যার কারণে সবাই চলে গেছে।
২০২৩ সালের ২ জুন গুচ্ছগ্রামে বরাদ্দপ্রাপ্ত বশির উদ্দিনের ভাগিনা সুজন মিয়ার (২৮) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনার পর প্রকল্পের বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে একে একে সরে যায়। ফলে পুরো গুচ্ছগ্রাম এখন পরিত্যক্ত।
জিনারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম রুহিদ বলেন, যোগাযোগের কোনো রাস্তা না থাকায় প্রকল্পটি বিকেল হলেই মাদককারবারিদের আড্ডায় পরিণত হয়। এখানে আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করাটাই ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।
হোসেনপুর থানার ওসি মারুফ হোসেন বলেন, স্থানীয়দের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর মাদককারবারিদের ধরতে পুলিশ গুচ্ছগ্রাম এলাকায় অভিযানে যায়। কিন্তু যাতায়াতের সুবিধা না থাকায় তারা আগেই পালিয়ে যায়।
হোসেনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী নাহিদ ইভা বলেন, বরাদ্দপ্রাপ্তদের নামে সরকার ঘর ও জমি লিখে দিয়েছে। তাই প্রশাসন চাইলেই বরাদ্দ বাতিল করতে পারছে না। আমরা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রস্তাবনা দেব। সে অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।