ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ঘুরে এলাম হাজার দ্বীপের দেশে

শাফায়াত চৌধুরী সৌরভ
প্রকাশিত: মার্চ ২৮, ২০২৬, ১২:৩৯ এএম

আমার আইল্যান্ড লাইফ ভীষণ পছন্দ। অনেক সময়ই মাঝে মাঝে চিন্তা করি যে আর কয়েক বছর চাকরি করে একটু সেভিংস এর পরে একটা রিমোট আইল্যান্ডে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব। কিন্তু কোথায় থাকতে চাই, এটা নিয়ে এখনো দ্বিধা আছে। এজন্য আমরা যেকোনো দেশে গেলেই কোনো না কোনো আইল্যান্ড-এ যাবোই। গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটা আইল্যান্ড ঘুরে আসার পরে একটা জায়গা আমার ভীষণ ভালো লেগেছে, সেটা হচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার গিলি ত্রাওয়াঙ্গান, বা  সংক্ষেপে গিলি-টি।

আমাদের মধ্যে অনেকেই গিলি-টি ঘুরে এসেছেন। যারা যাননি, তাদের জন্য একটা ছোট্ট ইনফরমেশন, এই আইল্যান্ড-এ কোনো মোটরাইজড ভেহিকেল নাই। এখানে চলাচলের মাধ্যম হচ্ছে ঘোড়ার গাড়ি এবং সাইকেল, কিন্তু কিছু কিছু ইলেকট্রিক বাইকও দেখা যায়। পরিবেশ দূষণ রোধ করার জন্য সকল রকম চেষ্টা এখানে করা হয়েছে, এখনো হচ্ছে, কিন্তু কোভিডের পরে এই দ্বীপের জীবনযাত্রায় একটা বড় পরিবর্তন চলে এসেছে।

গিলি টি-তে আমরা ৬টা সুন্দর দিন ছিলাম, এবং আমাদের ৪র্থ দিন আমি দ্বীপটার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে হেঁটে হেঁটে যাই এবং মানুষদের সঙ্গে কথা বলার, তাদের জীবন বোঝার চেষ্টা করি।

গিলি-টির পানি অদ্ভুত রং-এর নীল। এক পর্যায়ে মনে হয়েছিল যে এই পানি ফিলিপিন্সের ক্যাটিকল্যান থেকেও বেশি নীল। বালি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা হলে গিলি-টি’র অধিকাংশ মানুষ সুন্নি মুসলিম। আমি হেঁটে হেঁটে একটা বিশাল মসজিদও খুঁজে পাই। গিলির মানুষদের আমার খুব শান্তিপ্রিয় ও সহনশীল বলে মনে হয়। এর পাশাপাশি, যাদের সঙ্গেই কথা বলি, তাদের প্রত্যেককেই একে ওপরের প্রতি খুব রেস্ফেক্টফুল বলেও মনে হয়। ইসলামিক অনুশাসন মেনে চললেও এখানকার জীবন খুবই টুরিষ্ট ফ্রেন্ডলি।

গিলি-টি একেবারেই পর্যটনকেন্দ্রিক দ্বীপ। এখানকার জীবনযাত্রাটাই হচ্ছে সমুদ্রকে কেন্দ্র করে। সকালে সূর্য্য উঠার সঙ্গে সঙ্গে এখানে ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়, এবং সকল কার্যক্রম-ই নির্ভর করে সমুদ্রের মুডের উপরে। যেদিন সমুদ্রের অবস্থা ফেভারেবল থাকে না, সেদিন এখানে কোনো বোট থাকে না, ফলে জীবনযাত্রাও এক প্রকার থেমে যায়। ভোর থেকেই ডাইভিং সেন্টারগুলো খুলে যায়, যারা যারা ডাইভ করতে চান তাদের নিয়ে ডাইভিং বোটগুলো বের হয়ে যায়। গিলি-টিতে ডাইভিং অন্যতম প্রদান একটি কর্মকা-, এবং ডাইভিং সেন্টারও আছে প্রচুর। সকাল থেকেই গিলি-টি’র মেইন জেটি’র আশপাশে শুরু হয় মানুষের আনাগোনা। কেউ দ্বীপ ছেড়ে যাচ্ছে, কেউ দ্বীপ-এ নতুন আসছে। জেটি’র সঙ্গেই আছে সি-ফুডের বাজার, প্রচুর লোকসমাগম হয় এখানেও। সকাল থেকেই আরেকটা জিনিষ চোখে পরেÑ মেইনল্যান্ড থেকে প্রচুর সাপ্লাই এর আমদানি। খাবার থেকে শুরু করে ইট, বালু কিংবা গ্যাস সিলিন্ডার, সবকিছুই বোট থেকে নামিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে তোলা হয়।

হাল্কা দিন গড়ানো শুরু করলে শুরু হয় টুরিস্টদের ব্যাস্ততা। ব্রেকফাস্ট হোক বা ব্রাঞ্চ, সবাই হেঁটে বা সাইকেলে করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া শুরু করে। লাইফ এখানে স্লো, কোনো রকম রাশ নেই। রেস্টুরেন্টগুলো আস্তে আস্তে খোলা শুরু করে। আমি গিলি-টিতে সকালের নাস্তা হিসেবে প্যানকেকের প্রচুর প্রচলন দেখতে পাই। যেহেতু কোনো মোটর-ভেহিকেল নেই, তাই এই দ্বীপের যেকোনো জায়গা থেকে সমুদ্রের ¯্রােতের আওয়াজ পাওয়া যায়। আমরা যারা ঢাকার শব্দদূষণের সঙ্গে খুব পরিচিত, তাদের জন্য এই এক্সপেরিয়েন্সটা একেবারেই অন্যরকম।

আমি সকাল থেকে মোটামুটি ১০-১১টা  পর্যন্ত সারা দ্বীপটা হেঁটে দেখি। একপর্যায়ে একটা রেস্টুরেন্টের কর্মরত একজন ভদ্রমহিলা’র সঙ্গে কথা হয়। উনার সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি যে গিলিতে আসা অধিকাংশ মানুষ-ই এই দ্বীপের লোকাল না, বরং জাভা থেকে কাজের সন্ধানে এখানে সকলেই আসেন। জাভা এলাকায় কাজের সুযোগ কম, এবং গিলি-তে প্রচুর টুরিস্ট আসে বলে প্রায় সকলেই এখানে এসে কাজ করে, কিন্তু তারা তাদের উপার্জিত অর্থ দিয়ে জাভায় নিজের পরিবারের জন্য ব্যায় করেন। সেই ভদ্রমহিলা বলেনÑ উনার ফ্যামিলি জাভায় থাকেন, এবং উনি এখানে কাজ করে ও টিপস পেয়ে যা উপার্জন করেন তা দিয়ে উনি উনার বাবা-মা আর ছোট দুই বোনের পড়াশোনার খরচ বহন করতে পারেন। কিন্তু উনি নিজে গিলি-তে সেটেল করবেন না, কারণ এখানকার লিভিং কস্ট জাভা থেকে অনেক বেশি।

উনার গল্প শুনতে শুনতে আমিও বাংলাদেশের কথা শুরু করি। সেন্ট মার্টিন নিয়ে, আমাদের উপকূল এলাকার জীবনযাত্রা এবং মানসিকতা যে মোটামুটি একই এই ব্যাপারে উনাকে বলি। ভদ্রমহিলাকে একপর্যায়ে দাওয়াত দেই বাংলাদেশে আসার জন্য। উনি জানান যে উনাদের পরিবারের পুরুষেরা বাংলাদেশে যেতে চান তাবলিগ জামাতে জয়েন করার জন্য। আমার বেশ অবাক লাগলো, যে বাংলাদেশকে উনারা অনেকেই চিনেন এই পরিচয়টা দিয়ে, যে বাংলাদেশে তাবলিগের আয়োজন করা হয়।

প্রায় ১ ঘণ্টা উনার সঙ্গে গল্প করে আমি হোটেলে ফেরত আসি। এর পরে আবার বিকেলে বের হই, এবং তখনো আরেকটা ঘোড়ার গাড়ির চালকের সঙ্গে আমাদের রীতিমতো হার্ট-টু-হার্ট কনভার্সেশন হয়। বিকেল বা সন্ধ্যার এবং রাতের গিলি-টি অন্য রকম, সেটা নিয়ে পরবর্তীতে আবার লিখব।