ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মাতামুহুরীর বাঁকে মেঘেদের বসতি

মির্জা হাসান মাহমুদ
প্রকাশিত: এপ্রিল ৪, ২০২৬, ১২:৫০ এএম

ভোরের আলো তখনো পাহাড়ের গায়ে চড়েনি। চারিদিকে অপার্থিব নিস্তব্ধতা। দূরে কোথাও পাহাড়ি পাখির ডাক সেই নীরবতাকে ভেঙে দিয়ে জানান দিচ্ছে নতুন দিনের আগমন। আমরা দাঁড়িয়ে আছি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬০০ ফুট উঁচুতে, অনন্য পাহাড়চূড়ায়। পায়ের নিচে মেঘের ঘন সাদা চাদর, যার নিচে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে মাতামুহুরী নদী। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা মেঘ দেখে মনে হচ্ছে, যেন বিশাল তুলোর সমুদ্রের ওপর দাঁড়িয়ে আছি আমরা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের প্রথম রশ্মি মেঘের বুক চিরে ঠিকরে পড়ে, তখন নিচের নদীটি রুপালি ফিতার মতো চিকচিক করে ওঠে। এই দৃশ্য কিন্তু কোনো বিদেশি চলচ্চিত্রের সেটের নয়, বরং আমাদের দেশেরই এক নতুন পর্যটন বিস্ময় সুখিয়া ভ্যালির বর্ণনা দিচ্ছিলাম। বান্দরবান জেলার লামা উপজেলায় মাতামুহুরী নদীর কোল ঘেঁষে দাঁড়ানো এই পাহাড়ের সৌন্দর্য পর্যটকদের কাছে নতুন গন্তব্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। যেখানে নাগরিক কোলাহল পৌঁছাতে পারেনি এখনো, যেখানে মেঘ ও পাহাড়ের লুকোচুরি খেলা চলে দিনরাত।

দুই পাহাড়ের গল্প

স্থানীয় লোকগাথা ও ভূপ্রকৃতির সংমিশ্রণের ফলে এই অঞ্চলের নামকরণ বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। মাতামুহুরী নদী মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দুটি পাহাড়কে আলাদা করে দিয়েছে। স্থানীয়রা পাহাড় দুটিকে ডাকেন ‘সুইখ্যে-দুইখ্যে’ পাহাড় নামে। বাংলায় যা পরিচিতি পেয়েছে ‘সুখিয়া-দুখিয়া’ পাহাড় হিসেবে। দুখিয়া পাহাড়ের বুকে রয়েছে ছোট একটি ঝরনা। পাহাড়ের গা বেয়ে ঝরনার জল গড়িয়ে পড়াকে স্থানীয়রা কল্পনা করেন ‘পাহাড়ের কান্না’ হিসেবে। আর সেই বিষাদ থেকেই পাহাড়টির নাম হয়েছে দুখিয়া। বিপরীতে, তার ঠিক পাশেই সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু পাহাড়টি হলো সুখিয়া। এখানে মেঘেদের অবাধ বিচরণ, ভোরের স্নিগ্ধতা ও পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখা দিগন্তজোড়া সবুজের সমারোহ মানুষের মনে প্রশান্তি এনে দেয় বলে এর নাম রাখা হয়েছে সুখিয়া। এই সুখিয়া পাহাড়ের কথাই বলছি। একেই বলা হয় সুখিয়া ভ্যালি।

মাচাং ঘরে মেঘের মিতালি

সুখিয়া ভ্যালির প্রধান আকর্ষণ হলোÑ এর পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যশৈলী। পাহাড়ি ঐতিহ্যের সঙ্গে মিল রেখে এখানে তৈরি করা হয়েছে বাঁশের মাচাং ঘর এবং কাঠের নিখুঁত কারুকাজের কটেজ। আধুনিকতার ছোঁয়া থাকলেও তা প্রকৃতির ভারসাম্যকে নষ্ট করেনি। পাহাড়ের ঢালে বসানো এই মাচাং ঘরগুলোর বারান্দায় বসে যখন মেঘেদের উড়ে যাওয়া দেখা যায়, তখন মনে হয় যেন মেঘের রাজ্যেই আমাদের বসবাস।

এখানকার চারতলা বিশিষ্ট ওয়াচ টাওয়ারটি পর্যটকদের জন্য এক বিশেষ পাওয়া। টাওয়ারের সর্বোচ্চ তলায় দাঁড়িয়ে যখন ৩৬০ ডিগ্রি ভিউতে চারিদিকের পাহাড় দেখা যায়, তখন নিজেকে পৃথিবীর রাজা মনে হওয়াটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। একদিকে সাঙ্গু ও মাতামুহুরীর অববাহিকা, অন্যদিকে মেঘালয়ের পাহাড়ের আবছা রেখা মিলিয়ে এক অদ্ভুত ক্যানভাস।

যেভাবে যাবেন

সুখিয়া ভ্যালির যাত্রাটা যেমন সুন্দর, তেমনি রোমাঞ্চকর। মেঘের এই রাজ্যে পৌঁছাতে হলে আপনাকে প্রথমে আসতে হবে কক্সবাজারের চকরিয়া পৌর বাস টার্মিনালে। ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে আসা যেকোনো কক্সবাজারগামী বাসে চড়ে খুব সহজেই চকরিয়া নামা যায়। সেখান থেকে চাঁদের গাড়ি বা লোকাল বাসে করে যেতে হবে লামা বাজারে। আসল রোমাঞ্চ শুরু হয় লামা বাজার থেকে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে সুখিয়া ভ্যালির প্রবেশমুখ পর্যন্ত যাওয়ার পর প্রায় ৩০ মিনিটের ট্রেকিং। পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথ বেয়ে ওপরে ওঠার সময় চারপাশের নির্জনতা ও বুনো ফুলের ঘ্রাণ আপনার ক্লান্তি ভুলিয়ে দেবে। তবে পাহাড়ি পথ বিধায় সঙ্গে ভালো গ্রিপের জুতা থাকা আবশ্যক। নিরাপত্তার খাতিরে এবং সেনাবাহিনীর চেকপোস্টের প্রয়োজনে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সঙ্গে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।

যখন পাহাড় কথা বলে

সুখিয়া ভ্যালিতে যারা যান, তাদের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে ভোরের মেঘ দেখা। তবে এখানকার বিকেলটাও কম মোহনীয় নয়। দুপুরের রোদ যখন কিছুটা ম্লান হয়ে আসে, তখন ওয়াচ টাওয়ারে বসে সূর্যাস্ত দেখা ঐশ্বরিক অভিজ্ঞতা হতে পারে। মাতামুহুরী নদীর আঁকাবাঁকা গতিপথের পাশে দুখিয়া পাহাড়ের আড়ালে যখন সূর্যটা ডুবে যায়, তখন পুরো উপত্যকা মায়াবী গোধূলি রঙে ছেয়ে যায়।

রাত নামলে পাহাড়ের রূপ বদলে যায় পুরোপুরি। মাথার ওপর তখন লাখো কোটি তারার মেলা। শহরের ধোঁয়াশাচ্ছন্ন আকাশে যা কল্পনাও করা যায় না, এখানে আকাশ যেন হাতের নাগালে চলে আসে। মাচাংয়ের বারান্দায় শুয়ে তারাভরা আকাশ দেখতে দেখতে কখন যে রাতের গভীরতা বাড়ে, তা টের পাওয়া ভার। এখানে আসল জাদু শুরু হয় ভোর চারটা থেকে। হিমেল হাওয়ায় শরীরটা একটু কুঁকড়ে আসতে শুরু হলে বাইরে তাকালেই দেখা যাবে আপনি মেঘের ভেতর বন্দি। চারিদিকে সাদা ধোঁয়াটে মেঘ আর ঘন কুয়াশা। ওয়াচ টাওয়ারে উঠে দাঁড়ালে মনে হবে আপনি কোনো এক অলৌকিক দ্বীপে ভাসছেন, যার নিচে মেঘের সমুদ্র খেলা করছে।

আতিথেয়তা

পাহাড়ের চূড়ায় এত উঁচুতেও পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সব নাগরিক সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। থাকার জন্য কিছু রিসোর্ট রয়েছে এখানে। রাত্রিযাপনের জন্য কটেজ ছাড়াও যারা আরও একটু রোমাঞ্চ পছন্দ করেন, তাদের জন্য রয়েছে পাহাড়ের চূড়ায় তাবু বা টেন্টে থাকার সুযোগ। পাহাড়ি খাবারের স্বাদ ছাড়া পাহাড় ভ্রমণ যেন অপূর্ণ থেকে যায়। সুখিয়া ভ্যালির নিজস্ব প্যাকেজে মিলবে আদিম ও আধুনিক খাবারের মিশেল।