× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মিনহাজুর রহমান নয়ন

প্রকাশিত: এপ্রিল ৪, ২০২৬, ১২:৫২ এএম

ছুঁয়ে যাই ইতিহাসের পাতা

কেল্লাতাজপুরের অমর প্রেমের কাব্য

মিনহাজুর রহমান নয়ন

প্রকাশিত: এপ্রিল ৪, ২০২৬, ১২:৫২ এএম

কেল্লাতাজপুরের অমর প্রেমের কাব্য

বাংলার আকাশে-বাতাসে কত বীরত্বগাথা মিশে আছে, তার খোঁজ মেলে মায়মনসিংহের এই নিভৃত গ্রামে। ১৭শ শতকের মুঘল আমলের এক সাহসী রাজকন্যা সখিনা। যার তলোয়ারের ঝনঝনানি আর হৃদয়ের হাহাকার আজও কেল্লাতাজপুরের বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়। ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার এক নিভৃত গ্রাম কেল্লাতাজপুর। মাঠের সবুজ আর মেঠো পথের ধুলো মাখা এই গ্রামটি বয়ে চলেছে এক বীরত্বগাথা আর বিয়োগান্তক প্রেমের ইতিহাস। বাংলার বারো ভূঁইয়াদের উত্তরসূরিদের লড়াই আর হৃদয়ের হাহাকার মিশে আছে এখানকার প্রতি ধূলিকণায়। ১৭শ শতকের সেই বীরাঙ্গনা সখিনা বিবি আজও ঘুমে আছেন এক নিঝুম লোকালয়ে, যার সমাধি দেখতে আজও দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন পর্যটকরা।

ইতিহাসের পাতায় অমর এক রাজকন্যা

সখিনা ছিলেন কেল্লাতাজপুরের দেওয়ান উমর খাঁর কন্যা। রূপ আর গুণের খ্যাতি তার এতটাই ছিল যে, কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ির অধিপতি ঈশা খাঁর নাতি ফিরোজ খাঁ তার প্রেমে পড়েন। কিন্তু দেওয়ান উমর খাঁ এই বিয়েতে রাজি ছিলেন না। শুরু হয় এক অসম লড়াই। ফিরোজ খাঁ যুদ্ধে জয়ী হয়ে সখিনাকে বিয়ে করে জঙ্গলবাড়ি নিয়ে যান। কিন্তু উমর খাঁ এই পরাজয় ও অপমান ভুলতে পারেননি। তিনি কৌশলে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে ফিরোজ খাঁকে বন্দি করেন। স্বামীর বন্দিত্ব আর রাজ্যের বিপদে অন্দরমহলের মায়া ত্যাগ করে বেরিয়ে আসেন রাজকন্যা সখিনা।

রণক্ষেত্রে বীরত্ব ও নিয়তির নিষ্ঠুর খেলা

রেশমি পোশাক ছেড়ে গায়ে জড়ালেন যুদ্ধের বর্ম, মাথায় শিরস্ত্রাণ। পুরুষ বেশে সখিনা তলোয়ার হাতে নিজের বাবার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। রণক্ষেত্রে তার রণকৌশল আর সাহসের কাছে বাঘা বাঘা মুঘল সৈন্যরা খড়কুটোর মতো উড়ে যেতে লাগল। উমর খাঁ যখন পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে, তখনই তার ধূর্ত উজির এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্র করলেন। যুদ্ধের ময়দানে রটিয়ে দেওয়া হলো ‘বন্দি ফিরোজ খাঁ সখিনাকে তালাক দিয়েছেন।’ এই মিথ্যে অপবাদ সখিনার বীর হৃদয়ে তলোয়ারের চেয়েও বেশি আঘাত করল। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে তিনি রণক্ষেত্রেই ঢলে পড়লেন মৃত্যুর কোলে। পরে যখন তার শিরস্ত্রাণ খোলা হলো, সবাই স্তম্ভিত হয়ে দেখল সেই অকুতোভয় যোদ্ধা আর কেউ নন, স্বয়ং উমর খাঁর কন্যা সখিনা।

কাঠগোলাপের ছায়ায় ঘুমন্ত বীরাঙ্গনা

গৌরীপুরের মাওহা ইউনিয়নের কেল্লাতাজপুর কুমড়ি গ্রামে গেলেই দেখা মিলবে সখিনা বিবির নিভৃত সমাধি। সমাধিটিকে ঘিরে এক অদ্ভুত বিষাদমাখা সৌন্দর্য বিরাজ করে। এর চারপাশ ঘিরে থাকা কাঠগোলাপের গাছগুলো যেন প্রকৃতির জীবন্ত প্রহরী। বছরের পর বছর ধরে তারা ছায়া দিয়ে আগলে রেখেছে এই বীরকন্যাকে। কথিত আছে, ফিরোজ খাঁ মুক্তি পাওয়ার পর আমৃত্যু প্রতিটি বিকেল এই সমাধির পাশে প্রদীপ জ্বালিয়ে কাটিয়ে দিতেন। আজও সমাধির ওপরের লাল গিলাফ আর চারপাশের শান্ত পরিবেশ পর্যটকদের কয়েকশ বছর আগের সেই ট্র্যাজিক ইতিহাসে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

ভ্রমণের সুলুক সন্ধান ও গন্তব্য

রাজধানী ঢাকা থেকে সড়ক বা রেলপথে খুব সহজেই গৌরীপুর যাওয়া যায়। মহাখালী থেকে এনা, আলম এশিয়া বা শৌখিন বাসে চড়ে ময়মনসিংহ হয়ে কিংবা তিস্তা ও মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসের মতো দ্রুতগামী ট্রেনে সরাসরি গৌরীপুর জংশনে নামা যায়। সেখান থেকে স্থানীয় পরিবহনে চড়ে কেল্লাতাজপুর গ্রাম। যাতায়াতের পথটি বেশ মনোরম, যেখানে গ্রাম-বাংলার চিরচেনা রূপ দুচোখ জুড়িয়ে দেয়। তবে এলাকায় বর্তমানে উন্নত আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় পর্যটকদের সাধারণত দিনের আলো থাকতেই ফিরতে হয় ময়মনসিংহ শহরে।

স্মৃতির অন্তরালে অযতœ ও অবহেলা

ঐতিহাসিক এই স্থানটির রক্ষণাবেক্ষণে স্থানীয়রা সচেষ্ট থাকলেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব স্পষ্ট। বীরাঙ্গনা সখিনা বিবি কল্যাণ সংস্থার প্রধান মো. ফজলুল হক আগত পর্যটকদের মাজারের ইতিহাস শুনিয়ে মুগ্ধ করেন। তবে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে এই অমূল্য ঐতিহ্যকে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন প্রয়োজন। বাংলার ইতিহাসের এই অনন্য অধ্যায়টি আজও নিভৃতে ডুকরে কাঁদে, যা দেখার জন্য এক বিকেলে আপনিও বেরিয়ে পড়তে পারেন কেল্লাতাজপুরের পথে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!