ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বৈশাখী উৎসবে রঙের ঢাকা

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: এপ্রিল ১১, ২০২৬, ১২:৪১ এএম

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে অন্যতম বড় উৎসবের নাম পহেলা বৈশাখ। এই দিনটি বাঙালির বর্ষবরণের দিন। এটি কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা বদল নয়, বরং হাজার বছরের ঐতিহ্যের শেকড়ে ফেরার দিন। রাজধানী ঢাকা এই দিনে এক ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে। পুরো শহর যেন লাল-সাদার এক ক্যানভাসে সাঁজে। বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত হচ্ছে দেশ, এই উৎসবের আনন্দে অংশগ্রহণ করতে পারেন আপনিও।  ভ্রমণপিয়াসীদের জন্য পহেলা বৈশাখ মানেই ঢাকার অলিগলি চষে বেড়ানো। চলুন জেনে নেই পহেলা বৈশাখে ঢাকার কোথায় ঘুরবেন, কেমন হবে আপনার বৈশাখী প্রস্তুতি এবং পরিবারের সবাইকে নিয়ে কীভাবে দিনটি উপভোগ্য করা যায়। বিস্তারিত জানাচ্ছেন হাসিন রায়হান

রমনার বটমূল ও রমনা পার্ক

ঢাকার বৈশাখী উৎসবের নাম নিলেই সবার আগে চোখে ভাসে রমনার বটমূল। ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের আয়োজনে এখানে ভোরের রাগ ভৈরবীর মাধ্যমে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়। হাজারো মানুষের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে ‘এসো হে বৈশাখ’ গাইতে পারার অভিজ্ঞতা অমলিন। গান শেষ হওয়ার পর বিশাল রমনা পার্কে পরিবার নিয়ে হেঁটে বেড়ানো কিংবা কোনো গাছের ছায়ায় বসে জিরিয়ে নেওয়ার মাঝে এক ধরনের নাগরিক প্রশান্তি কাজ করে।

চারুকলা ও বৈশাখী শোভাযাত্রা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের হওয়া বৈশাখী শোভাযাত্রা এখন ইউনেস্কোর স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্য। বড় বড় পুতুল, মুখোশ ও লোকজ মোটিফের এই মিছিলটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। আপনি যদি চিত্রশিল্পী বা শিল্পপ্রেমী হন, তবে চারুকলায় আঁকাআঁকি ও কাঠামো তৈরির কর্মযজ্ঞ দেখা আপনার জন্য বাধ্যতামূলক। তবে মনে রাখবেন, এখানে ভিড় থাকে আকাশচুম্বী, তাই যারা শিশুদের নিয়ে আসবেন তারা আগেভাগেই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।

পুরান ঢাকা ও হালখাতা

আধুনিকতার ভিড়ে ঐতিহ্যের গন্ধ পেতে চাইলে চলে যান পুরান ঢাকায়। শাঁখারীবাজার বা তাঁতীবাজারের গলিগুলোতে লাল কাপড়ে মোড়ানো খাতা বা ‘হালখাতা’র পুরোনো সংস্কৃতি এখনো জীবন্ত। এখানকার চকবাজার বা নাজিরা বাজারে বৈশাখী খাবারের যে বৈচিত্র্য পাবেন, তা শহরের অন্য কোথাও মেলা ভার। মিষ্টি, দই আর ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমাহারে আপনার জিভে জল আসতে বাধ্য।

ধানমন্ডি লেক ও রবীন্দ্র সরোবর

যারা একটু শান্ত পরিবেশে গান শুনতে শুনতে বৈশাখ উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য ধানমন্ডি লেক সেরা জায়গা। রবীন্দ্র সরোবরের উন্মুক্ত মঞ্চে সারাদিন চলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। লেকের পাড়ে বসে আড্ডা দেওয়া আর ফেরিওয়ালার কাছ থেকে মাটির গহনা কেনা; সব মিলিয়ে এক স্নিগ্ধ অনুভূতি পাওয়া যায় এখানে।

হাতিরঝিল ও পূর্বাচল ৩০০ ফিট

যান্ত্রিক ঢাকার আধুনিক রূপ দেখতে চাইলে হাতিরঝিল বা পূর্বাচল ৩০০ ফিট সড়ক এখন দারুণ জনপ্রিয়। বিশেষ করে বিকেলে বা সন্ধ্যায় হাতিরঝিলে নৌকায় চড়ে আলোকসজ্জা দেখা বা ৩০০ ফিট এলাকায় খোলা বাতাসে সময় কাটানো অনেকের পছন্দ। তবে বৈশাখের এই দিনগুলোতে এখানে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা হতে পারে, তাই হাতে সময় নিয়ে বের হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

বৈশাখী প্রস্তুতি

বৈশাখ মানে গরম। রোদেলা দুপুরে রোমাঞ্চ ধরে রাখতে পোশাক নির্বাচনে সচেতন হতে হবে। বৈশাখের শাড়ি বা পাঞ্জাবি মানেই যে ভারী তসর বা সিল্ক হতে হবে, তা নয়। বরং আরামের কথা মাথায় রেখে সুতির ওপর প্রাধান্য দিন। সুতি কাপড় ঘাম শোষণ করে এবং শরীরে বাতাস চলাচলের সুযোগ দেয়।  লাল-সাদা চিরায়ত রং হলেও, বর্তমান সময়ে অফ-হোয়াইট, হালকা বাসন্তী বা জলপাই রঙের পোশাকও বেশ মানানসই। হালকা রঙের পোশাক তাপ শোষণ কম করে।  দিনভর অনেকটা পথ হাঁটতে হবে, তাই খুব উঁচু বা আঁটসাঁট জুতা না পরাই ভালো। ভালো মানের ফ্ল্যাট স্যান্ডেল বা আরামদায়ক চটি জুতা বেছে নিন। মেকআপ যতটা সম্ভব হালকা রাখা ভালো। ওয়াটারপ্রুফ প্রসাধন ব্যবহার করুন যাতে ঘামে সাজ নষ্ট না হয়। সাথে সবসময় টিস্যু বা রুমাল রাখুন।

রোদে পোড়া থেকে বাঁচতে

চৈত্র-বোশেখের কাঠফাটা রোদে অসুস্থ হয়ে পড়া অস্বাভাবিক নয়। আনন্দ যেন বিষাদে রূপ না নেয় সেজন্য কিছু নিয়ম মেনে চলুন:

পানিশূন্যতা রোধ : সঙ্গে সবসময় পানীয় জলের বোতল রাখুন। রাস্তার খোলা শরবত বা কাটা ফল এড়িয়ে চলাই নিরাপদ। এর বদলে স্যালাইন বা গ্লুকোজ মেশানো জল খেতে পারেন।

রোদ থেকে সুরক্ষা : ব্যাগে একটি রোদচশমা এবং ছাতা অবশ্যই রাখুন। কপালে রোদ না লাগিয়ে চওড়া হ্যাটও ব্যবহার করা যেতে পারে। বের হওয়ার ২০ মিনিট আগে ভালো মানের সানস্ক্রিন লাগিয়ে নিন।

খাবারের সতর্কতা : বৈশাখী আয়োজনে পান্তা-ইলিশ একটি জনপ্রিয় মেন্যু। তবে বাইরের দোকানে পান্তাভাত খাওয়ার আগে তার পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে নিশ্চিত হোন। রাস্তার ধারের ভাজাপোড়া বা অতিরিক্ত মশলাদার খাবার হজমে সমস্যা করতে পারে। দিনের বেলা হালকা খাবার খাওয়াই শ্রেয়।

ভিন্ন পরিকল্পনা

একা ভ্রমণ বা বন্ধুদের সঙ্গে : একা ভ্রমণে স্বাধীনতা বেশি থাকে। আপনি চাইলে ভোরে রমনা বটমূল দিয়ে শুরু করে সারাদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা চষে বেড়াতে পারেন। মোবাইল ফোনে পাওয়ার ব্যাংক সঙ্গে রাখুন এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যাগ বা ভারী জিনিসপত্র বহন করবেন না যাতে ভিড়ের মধ্যে সাবলীলভাবে চলাফেরা করা যায়।

পরিবার ও শিশুদের নিয়ে : পরিবার নিয়ে বের হলে ভিড় এড়িয়ে চলাই ভালো। বিশেষ করে ছোট শিশুদের নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রার একেবারে ভেতরে না গিয়ে পাশ থেকে দেখা নিরাপদ। রমনা পার্ক বা ধানমন্ডি লেকের মতো ঘেরা জায়গায় শিশুদের নিয়ে ঘোরাঘুরি করা সহজ। তাদের ব্যাগে জরুরি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র (জল, ওষুধ, হালকা শুকনো খাবার) আগে থেকেই গুছিয়ে নিন। জনসমাগমস্থলে শিশুদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখুন।

পহেলা বৈশাখ আমাদের পরিচয়ের উৎসব। ঢাকা শহরের ইট-পাথরের মাঝে এই একটি দিনেই আমরা মাটির টানে এক হই। কিন্তু উৎসবের আনন্দ তখনই সার্থক হয় যখন আমরা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকি। রাস্তায় জ্যাম কিংবা ভিড় দেখে মেজাজ না হারিয়ে বরং হাসিমুখে সবাইকে শুভেচ্ছা জানানোর নামই বৈশাখ। আপনার যাত্রা শুভ হোক।