বাংলা বছরের প্রথম মাস বৈশাখ এলেই যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায় আমাদের গ্রাম-বাংলা। প্রকৃতির বুকজুড়ে নেমে আসে এক অনন্য উচ্ছ্বাস, নতুন সূর্যের আলোয় ধুয়ে-মুছে যায় পুরোনো দিনের ক্লান্তি। ঠিক তেমনি রাজবাড়ী জেলার কাটাখালি অঞ্চলের ছোট্ট গ্রাম কৃষ্ণতলাও বৈশাখ এলেই সেজে ওঠে এক বর্ণিল উৎসবের আমেজে। চারপাশের সবুজ ধানখেত, খোলা মাঠ আর গ্রামের সরল মানুষের প্রাণের উচ্ছ্বাস মিলে এই গ্রামটিকে পরিণত করে এক বিশাল আনন্দমেলার কেন্দ্রে।
প্রতি বছর বৈশাখের শুরুতেই কৃষ্ণতলার সেই খোলা মাঠে বসে বিশাল এক মেলা। ধান খেতের পাশের এই মাঠটি যেন একদিনেই বদলে যায়Ñ নির্জনতা ছেড়ে তা হয়ে ওঠে মানুষের ঢল আর উৎসবের কোলাহলে ভরা এক প্রাণচঞ্চল স্থান। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে এই মেলা দেখতে। শুধু রাজবাড়ী জেলা নয়, আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ ভিড় জমায় এই কৃষ্ণতলার বৈশাখী আয়োজন দেখতে। এই মেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো ‘বরশি মেলা’। এটি এমন এক দৃশ্য, যা দেখার জন্য মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে। বিশাল এক বরশি দিয়ে মানুষের পিঠে গেঁথে তাকে উপরে তুলে চারপাশে ঘোরানো হয়। অনেকটা নাগরদোলার মতো করে মানুষটি আকাশে ঘুরতে থাকে। এই দৃশ্য দেখলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় সবাই। কেউ কেউ ভয় পায়, আবার কেউ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। কীভাবে একজন মানুষ এত সাহস নিয়ে এই আয়োজনের অংশ হয়, তা ভাবতেই অবাক লাগে। তবে এটি গ্রামের বহু বছরের একটি ঐতিহ্য, যা এখনো একইভাবে চলে আসছে।
মেলার চারপাশে সাজানো থাকে নানান রকমের দোকানপাট। কোথাও চটপটির দোকান, কোথাও হালিমের গন্ধে ভরে থাকে বাতাস। মিষ্টির দোকানে দেখা যায় বাতাসা, জিলাপি, নানা রকম পিঠা। ছোট ছোট বাচ্চারা বেলুন হাতে ঘুরে বেড়ায়, তাদের হাসিতে মেলা যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। হাত সাজানোর দোকানে মেয়েরা ভিড় করে, রঙিন চুড়ি আর মেহেদির রঙে রাঙিয়ে তোলে নিজেদের।
এ ছাড়া মাটির তৈরি নানা শিল্পকর্ম এই মেলার আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ। মাটির তৈরি কলসি, হাঁড়ি, ব্যাংক, ফলের আদলে তৈরি খেলনাÑ সবকিছুই যেন আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। গ্রামের কারিগরদের হাতে তৈরি এসব জিনিস শুধু খেলনা নয়, বরং একেকটি শিল্পকর্ম। অনেকেই এগুলো কিনে নিয়ে যায় স্মৃতি হিসেবে।
শিশুদের জন্য মেলায় থাকে নানা ধরনের খেলা। নাগরদোলা, দোলনা, খেলনা গাড়ি, সবকিছুতেই শিশুদের ভিড় লেগে থাকে। তারা তাদের বাবা-মায়ের হাত ধরে আনন্দে ছুটে বেড়ায় এক দোকান থেকে আরেক দোকানে। তাদের হাসি আর চিৎকারে পুরো মেলা মুখরিত হয়ে ওঠে।
মেলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গ্রামের মানুষের অংশগ্রহণ। কৃষ্ণতলার মানুষ এই মেলাকে কেন্দ্র করে সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে। বৈশাখ এলেই তারা নতুন করে সাজিয়ে তোলে নিজেদের গ্রামকে। কেউ দোকান বসায়, কেউ আয়োজনের দায়িত্ব নেয়, আবার কেউ শুধু আনন্দ উপভোগ করে। ঢোল-ডগরের শব্দে চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে, সেই সঙ্গে বাজে বৈশাখী গান, যা গ্রামটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
এই মেলা শুধু একটি উৎসব নয়, এটি গ্রামের মানুষের মিলনমেলা। এখানে ধনী-গরিব, ছোট-বড়; সবাই একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে। পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে আড্ডা জমে ওঠে। একদিনের জন্য হলেও মানুষ ভুলে যায় জীবনের সব কষ্ট, দুঃখ আর অভাব। বৈশাখ মানেই নতুন শুরু, নতুন আশা। আর কৃষ্ণতলার এই বৈশাখী মেলা সেই নতুন আশারই প্রতীক। এটি শুধু একটি গ্রামের উৎসব নয়, বরং আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। যেখানে ঐতিহ্য, আনন্দ আর মানুষের ভালোবাসা মিলেমিশে তৈরি করে এক অপূর্ব পরিবেশ।
কৃষ্ণতলা গ্রামটি বৈশাখ এলেই যেন এক রঙিন স্বপ্নে পরিণত হয়। ধান খেতের সবুজের মাঝে, মানুষের হাসির শব্দে আর ঢোলের তালে তালে এই গ্রামটি হয়ে ওঠে এক জীবন্ত উৎসবের নাম। এই মেলার স্মৃতি মানুষের মনে রয়ে যায় সারা বছর, আর তারা অপেক্ষা করে আবার কবে আসবে সেই প্রিয় বৈশাখ, কবে আবার সেজে উঠবে তাদের প্রিয় কৃষ্ণতলা।
লেখক : ইরাক প্রবাসী

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন