উত্তরের দিগন্তজোড়া ধানখেত। সেখানে সূর্যের আলো পড়তেই মনে হয় চলে আসলাম কবি জসীমউদ্দীনের নকশিকাঁথার মাঠে। সকালের ব্যস্ততা শেষে যখন তপ্ত দুপুরে একটু জিরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন, ঠিক তখনই আপনার মনকে নাড়া দিতে পারে উত্তরের এক জনপদ ধানের খেত পেরিয়ে যেখানে ব্রহ্মপুত্রের হাওয়া এসে গায়ে লাগে, সেটিÑ গাইবান্ধা। গাইবান্ধা এখন আর কেবল চরাঞ্চল নয়; এটি এখন প্রকৃতি, ইতিহাস আর আধুনিকতার এক দারুণ কোলাজ।
মাটির নিচে এক অন্য পৃথিবী : ফ্রেন্ডশিপ সেন্টার
শহর থেকে অটোরিকশায় মিনিট দশেকের পথ। মদনেরপাড়ায় পৌঁছে আপনি হয়তো থমকে দাঁড়াবেন। ভাববেন, কোথায় সেই বিখ্যাত ‘ফ্রেন্ডশিপ সেন্টার’? সামনে তো কেবল সবুজ ঘাসের গালিচা। কিন্তু সেই ঘাসের নিচেই লুকিয়ে আছে স্থাপত্যের এক বিস্ময়।
আট বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই ভবনটি আন্তর্জাতিক ‘আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার’ জয়ী। মাটির গভীরে ইট-সিমেন্টের এই শৈল্পিক কারুকাজ আপনাকে মনে করিয়ে দেবে প্রাচীন মহাস্থানগড়ের কথা। এখানে নেই কোনো কৃত্রিম শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, অথচ মাটির নিচের প্রাকৃতিক শীতলতায় মন জুড়িয়ে যায়। শান্ত, নিস্তব্ধ এই পরিসরের লাইব্রেরি বা উঠোনে দাঁড়িয়ে আপনি অনুভব করবেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
ব্রহ্মপুত্রের ঢেউ আর রুপালি ইলিশের স্বাদ : বালাসী ঘাট
বিকেলের রোদ যখন একটু মিইয়ে আসবে, আপনার গন্তব্য হওয়া চাই বালাসী ঘাট। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখার আনন্দই আলাদা। বর্ষায় থৈ থৈ পানি আর শীতে মাইলের পর মাইল চরের এই ভিন্ন রূপ আপনাকে মুগ্ধ করবে।
৪০০-৫০০ টাকায় একটি নৌকা ভাড়া করে যখন ব্রহ্মপুত্রের বুকে ভাসবেন, মনে হবে আপনি কোনো এক জীবন্ত ক্যানভাসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। নদীর ওপারে মরিচ আর ভুট্টার চরাঞ্চল যেন সবুজের কার্পেট বিছিয়ে রেখেছে। চাইলে ২০-৫০ টাকায় ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে চরের দিগন্ত রেখা ছুঁয়ে আসতে পারেন। ভ্রমণ শেষে ঘাটের ধারের ছোট কোনো হোটেলে যখন ব্রহ্মপুত্রের টাটকা বোয়াল বা কাজলি মাছের ঝোল দিয়ে গরম ভাত খাবেন, সেই স্বাদ আপনার মুখে লেগে থাকবে বহু বছর।
রাতের আলোকসজ্জায় ঘাঘট লেক
সন্ধ্যা নামতেই গাইবান্ধা শহর এক মায়াবী রূপ নেয়। পরিত্যক্ত ঘাঘট নদীকে সংস্কার করে তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন ‘ঘাঘট লেক’। স্থানীয়রা একে ভালোবেসে ডাকে ‘গরিবের হাতিরঝিল’। লেকের ওপর অত্যাধুনিক দুটি সেতুতে যখন অটোমেটিক বাতিগুলো জ্বলে ওঠে, পানির আয়নায় সেই আলোর খেলা দেখে আপনার শহরতলীর ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে যাবে। পাশে থাকা ঘাঘট শিশু পার্কে শিশুদের নিয়ে কাটানো যাবে দারুণ কিছু মুহূর্ত।
আভিজাত্যের স্পর্শ এসকেএস ইন
আপনি যদি একটু বিলাসবহুল সময় কাটাতে চান, তবে রাধাকৃষ্ণপুরের ‘এসকেএস ইন’ আপনার জন্য এক টুকরো স্বর্গ। ২০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই ফোর-স্টার রিসোর্টের ঝুলন্ত সেতু আর সুইমিং পুলের নীল জলরাশি আপনাকে ভুলিয়ে দেবে যে আপনি কোনো মফস্বল শহরে আছেন।
রাতযাপনের জন্য এখানকার ওয়াটার ভিলা বা গার্ডেন ভিউ ভিলাগুলো হতে পারে আপনার ঈদের ছুটির সেরা উপহার। রাতে যখন নিজস্ব শিল্পীদের গানে আসর বসে, তখন রিসোর্টের পরিবেশটি হয়ে ওঠে রাজকীয়।
ইতিহাস ও কল্পনার জগৎ
যাদের ভ্রমণে একটু জানার তৃষ্ণা থাকে, তাদের জন্য পলাশবাড়ীর ‘ডিমল্যান্ড পার্ক’ অনন্য। এখানে ২৫৫ জন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীর ভাস্কর্য রয়েছেÑ যা খোলা আকাশের নিচে এক জীবন্ত বিশ্বকোষ। অন্যদিকে, সুন্দরগঞ্জের তিস্তা নদীর পাড়ে অবস্থিত ‘আলী বাবা থিমপার্ক’ যেন রূপকথার জগৎ। প্রবেশ পথেই মহান আল্লাহর ৯৯ নাম খচিত বিশালাকার ভাস্কর্য আর ভেতরে আলাদিনের চেরাগ ও কৃত্রিম আগ্নেয়গিরি দেখে শিশুরা শিহরিত হবেই।
প্রাচীন ঐতিহ্যের সন্ধানে
ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য গোবিন্দগঞ্জের রাজা বিরাট প্রাসাদ হতে পারে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। জনশ্রুতি আছে, মহাভারতের বিরাট রাজার রাজধানী ছিল এখানে। বর্তমানে রাজপ্রাসাদটি মাটির নিচে চাপা পড়ে এক বিশাল ঢিবির রূপ নিয়েছে। প্রাচীন ইটের স্তর আর বিশাল সব পুকুর আজও সাক্ষ্য দেয় কয়েক হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতার।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সরাসরি এসি বা নন-এসি বাসে গাইবান্ধা যেতে পারেন। এ ছাড়া রংপুর এক্সপ্রেস বা লালমনি এক্সপ্রেসে করে বোনারপাড়া বা গাইবান্ধা স্টেশনে নামা যায়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন