× UCB Sticker Card
সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মেহরুন নিশি

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ০১:৪৩ এএম

দেশের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম

মেহরুন নিশি

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ০১:৪৩ এএম

দেশের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম

বান্দরবানের রুমা উপজেলা সদর থেকে বগালেকের দিকে পিচঢালা পাহাড়ি পথ ধরে এগোলে দুই পাহাড়ের বাঁকে হঠাৎ ছবির মতো সাজানো জনপদ চোখে পড়ে। রুক্ষ পাহাড়ের বুকে এমন পরিপাটি গ্রামের দৃশ্য দেখে ভ্রমণপিপাসু যে কারো মনে হতে পারেÑ এ যেন বিদেশের কোনো পাহাড়ি গ্রাম। এটি হলো মুনলাই পাড়া। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত বম জনগোষ্ঠীর ছোট এই গ্রামটি বর্তমানে বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে অনন্য উদাহরণ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শুধু সৌন্দর্য নয়, বরং শৃঙ্খলতা আর পরিচ্ছন্নতার মাপকাঠিতে এই পাড়াকে বর্তমানে দেশের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ঐতিহ্যের ছায়ায় আধুনিক জীবন

মুনলাই পাড়া মূলত বম সম্প্রদায়ের একটি বসতি। পাহাড়ের ঢালে প্রায় ৭০টি পরিবারের বসবাস এখানে। এই গ্রামটি কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং এটি একটি আদর্শিক জীবনদর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। বম জনগোষ্ঠীর মানুষগুলো জন্মগতভাবেই প্রকৃতিপ্রেমী এবং শিল্পমনা। তাদের ঘরবাড়ি তৈরির ঢং, আঙিনা সাজানোর পরিপাটি ধরন এবং জীবনযাপনের প্রতিটি স্তরে এক ধরনের স্বকীয়তা লক্ষ্য করা যায়।

২০১৯ সালে তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে মুনলাই পাড়াকে তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে সবচেয়ে পরিকল্পিত এবং পরিচ্ছন্ন গ্রাম হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পাহাড়ের চূড়ায় এই গ্রামের প্রতিটি গলি যেন ঝকঝকে তকতকে এক গালিচা। প্রতিটি বাড়ির সামনে রয়েছে ছোট ছোট ফুলের বাগান। গ্রামের মানুষগুলো তাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি আর প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে এমনভাবে লালন করছে, যা সমতলের ব্যস্ত জীবনের মানুষের কাছে এক বিস্ময়কর প্রশান্তি।

কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম

বাংলাদেশে টেকসই পর্যটন বা ‘কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম’-এর সফলতম প্রয়োগ ঘটেছে মুনলাই পাড়ায়। এটি কেবল পর্যটকদের ঘুরতে আসার জায়গা নয়, বরং এখানকার মানুষরাই তাদের পর্যটন কার্যক্রমের প্রধান পরিচালক। বেসক্যাম্প অ্যাডভেঞ্চারস লিমিটেডের কারিগরি সহায়তায় এই গ্রামে পর্যটকদের জন্য ‘হোম-স্টে’ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। এর ফলে পর্যটকরা কেবল গ্রামটি দেখে ফিরে আসেন না, বরং সরাসরি পাহাড়ি মানুষের মাচাং ঘরে থেকে তাদের জীবনযাত্রা উপলব্ধি করতে পারেন। এখানকার ঘরগুলো মাচার ওপর কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি হলেও তাতে আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন ও আরামদায়ক বিছানার ব্যবস্থা রয়েছে। পর্যটকরা যখন এসব বাড়িতে থাকেন, তখন তাদের আতিথেয়তার সম্পূর্ণ লভ্যাংশ সরাসরি স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে যায়। এটি যেমন গ্রামবাসীর জীবনমান উন্নয়ন করছে, তেমনি পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতার দ্বার খুলে দিয়েছে।

রোমাঞ্চ ও প্রকৃতির মেলবন্ধন

শান্তি এবং নির্জনতা ছাড়াও যারা একটু রোমাঞ্চ পছন্দ করেন, তাদের জন্য মুনলাই পাড়া এক স্বর্গরাজ্য। পাহাড়ের গাছগুলোর ডালপালাকে ব্যবহার করে এখানে তৈরি করা হয়েছে ‘ট্রি টপ অ্যাক্টিভিটিজ’। জিপ লাইনিং বা পাহাড়ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দড়িতে ঝুলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আপনাকে এক নিমিষেই শিহরিত

করবে। এ ছাড়াও পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা স্রোতস্বিনীতে কায়াকিং করার সুযোগ রয়েছে।

দিনের আলো ফুরিয়ে যখন পাহাড়ের বুকে অন্ধকার নেমে আসে, তখন শুরু হয় রাতের আয়োজন। পাহাড়ের শীতল হাওয়ায় ক্যাম্প ফায়ার বা বারবিকিউর গন্ধে জমে ওঠে ভ্রমণকারীদের আড্ডা। একদিকে চাঁদের আলোয় পাহাড়ের গম্ভীর রূপ, অন্যদিকে বম জনগোষ্ঠীর সহজ-সরল জীবনবোধ মিলিয়ে এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি হয়।

আতিথেয়তা

মুনলাই পাড়ায় কোনো জাঁকজমকপূর্ণ আধুনিক রেস্টুরেন্ট নেই, আর তার প্রয়োজনও নেই। এখানকার আতিথেয়তার মূল শক্তি হলো ‘ঘর’। আপনি যে হোমস্টে বা কটেজে থাকবেন, তারাই আপনার খাবারের দায়িত্ব নেবে। পাহাড়ের নিজস্ব জুমের চালের ভাত, দেশি মুরগির মাংস, পাহাড়ি আলু এবং সম্পূর্ণ রাসায়নিকমুক্ত স্থানীয় সবজির স্বাদ আপনার জিহ্বায় লেগে থাকবে বহুক্ষণ। পাহাড়ি বাঁশ কোড়ল বা নাপ্পির স্বাদ যারা পছন্দ করেন, তাদের জন্য এখানে খাবারের পাতে থাকে বাড়তি তৃপ্তি। খাবারের এই সারল্যই বুঝিয়ে দেয়, প্রকৃতির কতটা কাছাকাছি রয়েছেন আপনি।

যাত্রাপথের দিগন্ত

মুনলাই পাড়ার এই মায়াবী রাজ্যে পৌঁছানোর যাত্রাটাও মন্দ নয়। রাজধানী ঢাকা থেকে বাসে সরাসরি বান্দরবান শহর। তারপর সেখান থেকে জিপ বা স্থানীয়দের ভাষায় ‘চাঁদের গাড়ি’ রিজার্ভ নিয়ে পাহাড়ি পথ ধরে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার পথ। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা ঢাল বেয়ে গাড়ি যখন উপরের দিকে উঠতে থাকে, তখন জানালার পাশে পাহাড়ের খাদের গভীরতা আর মেঘের আনাগোনা এক রোমাঞ্চকর পরিবেশ তৈরি করে। এ ছাড়া যারা রুমা পর্যন্ত বাসে যান, তারা সেখান থেকেও বাইক বা জিপে করে বগালেকের পথে যেতে যেতে মুনলাই পাড়ায় যাত্রা বিরতি নিতে পারেন।

সচেতনতা

মুনলাই পাড়া শুধু একটি ভ্রমণের জায়গা নয়, এটি একটি সংস্কৃতি। তাই এই গ্রামে যাওয়ার আগে পর্যটকদের কিছু নৈতিক দায়িত্ব পালনের মানসিকতা রাখা প্রয়োজন:

সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা : বম জনগোষ্ঠীর নিজস্ব রীতিনীতি ও পোশাক-আশাকের প্রতি সম্মান রাখা একান্ত কাম্য। অনুমতি ছাড়া কারো ব্যক্তিগত জায়গায় প্রবেশ বা ছবি তোলা থেকে বিরত থাকা উচিত।

পরিবেশ সচেতনতা : মুনলাই পাড়ার মূল সৌন্দর্য এর পরিচ্ছন্নতা। তাই চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল বা কোনো আবর্জনা যত্রতত্র ফেলে এই পরিচ্ছন্ন গ্রামটিকে কলুষিত করা থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে।

নিরাপত্তা ও পরিচয় : পাহাড়ি পথে ভ্রমণের সময় জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সঙ্গে রাখা জরুরি, কারণ পথে বিভিন্ন চেকপোস্টে এর প্রয়োজন হতে পারে।

আর্দ্রতা ও সাবধানতা : বৃষ্টির সময় পাহাড় পিচ্ছিল হয়ে ওঠে, তাই ভালো গ্রিপের জুতা ব্যবহার করা ও সাবধানে পা চালানো জরুরি।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!