× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ইয়াছিন ইবনে ফিরোজ 

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ০১:৪৫ এএম

ঘুরে এলাম

একটি বিয়েবাড়ি ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা নওয়াবের পদচিহ্ন

ইয়াছিন ইবনে ফিরোজ 

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ০১:৪৫ এএম

একটি বিয়েবাড়ি ও দক্ষিণ এশিয়ার  প্রথম মহিলা নওয়াবের পদচিহ্ন

২৩ জানুয়ারি ২০২৩। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে প্রথম ক্লাসে যেদিন পা রেখেছিলাম, সেদিন কি জানতাম এই লালমাটির ক্যাম্পাস আমার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হয়ে উঠবে? মানুষ কখনো জানে না, পৃথিবীর কোনো অচেনা মাটিতে তার শেকড় শক্ত হয়ে গেঁথে যাবে। তিনটি বছর পেরিয়ে গেছে চোখের পলকে। অনেক কিছু পেয়েছি, আবার অনেক কিছু হারিয়েছিও। কিন্তু জীবনের অর্জনের খাতায় যা জমা হয়েছে, তা আমি নিঃসঙ্কোচে স্বীকার করে নিতে রাজি। সেই অর্জনের সবচেয়ে মূল্যবান অংশটুকু হলো কিছু মানুষ। যে মানুষগুলো আমাকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছে, কেবল রক্তের সম্পর্ক নয়, কলম হাতে নেওয়া মানুষেরাও চাইলে একটা আলাদা পরিবার গড়ে নিতে পারে। আজকের দিনটার কথা লিখতে বসলে বুকের ভেতর থেকে অদ্ভুত এক উষ্ণতা উথলে ওঠে। আজ এপ্রিলের দশ তারিখ। বসন্ত শেষ হতে বেশি দেরি নেই কিন্তু এর মধ্যে এমন একটি দিন এলো, যাকে কেবল ‘বিশেষ’ বললে যেন তার প্রতি কিছুটা অবিচারই করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর কৌতূহলবশত অনেকগুলো সংগঠনের দরজায় টোকা দিয়েছি। কিছু দরজা আমার জন্য খুলেছে, কিছু বন্ধ থেকেছে, আর কিছু দরজা থেকে আমি নিজেই নীরবে সরে এসেছি। কিন্তু একটি সংগঠন সবসময় আমাকে টেনে রেখেছে অদৃশ্য এক মায়ার সুতোয়, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা’। লেখালেখি আমার রক্তে মেশা প্রবল এক নেশা। কেউ নিষেধ করলেও আমি কলম থামাতে পারি না। কারণ আমার কাছে লেখা কেবল শব্দ সাজানো নয়, এটা নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো; না লিখলে বুকের ভেতর দম বন্ধ হয়ে আসে। এই ফোরামের মানুষগুলো আমার সেই স্পন্দনটা বোঝে। তাই তো তিন বছর ধরে এই পরিবারের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছি, থাকব। পরিবারের কেউ ব্যথা পেলে আমরা সবাই সেই ব্যথা অনুভব করি। আবার কেউ খুশি হলে, সেই খুশির ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে সবার বুকে। আজ ছিল তেমনই এক বিশেষ খুশির দিন,আমাদের ফোরামের সহ-সভাপতি ইসরাত আপুর বিয়ে। এক সপ্তাহ আগে থেকেই দাওয়াত পেয়েছিলাম। তারপর থেকেই আমাদের মধ্যে চলতে থাকে পরিকল্পনার তুমুল ঝড়। শেষমেশ যাওয়ার দিন ঘনিয়ে এলো। অনেকেই যাওয়ার কথা বলেছিলেন, কিন্তু ব্যস্ত জীবনের নানান বাঁক ঘুরে শেষ পর্যন্ত টিকে রইলাম আমরা পাঁচজন। আমাদের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান উপদেষ্টা রাজীব ভাই, তামিম, মারুফ, রাসেল এবং আমি। রাজীব ভাই প্রথমে নিজের ব্যস্ততার দোহাই দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা নাছোড়বান্দা! একজন সভাপতি কি পারেন তার পরিবারের এমন আনন্দের দিনে অনুপস্থিত থাকতে? পারেন না। শেষমেশ তিনি রাজি হলেন, আর তার সেই রাজি হওয়াটাই পরে পুরো দিনটাকে আরও পূর্ণতা এনে দিল।

সকাল এগারোটা চল্লিশ মিনিট। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। অটোরিকশায় চেপে প্রথমে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে এসে পৌঁছলাম। সেখান থেকে দুপুর বারোটা দশ মিনিটে একটি সিএনজিতে চেপে বসলাম পাঁচজন। পথের দুই ধারে তখন বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, মাঝে মাঝে ছোট গ্রামের উঠোন থেকে ওঠা ঝুলন্ত ধোঁয়া, জলাভূমিতে সাদা বকের ঝাঁক, কুমিল্লার গ্রামীণ নিসর্গ যেন এক জলরঙের ক্যানভাস হয়ে আমাদের পাশ দিয়ে সরে সরে যাচ্ছিল। গাড়ির হু হু বাতাসে বড় ভাই বন্ধু ও ছোট ভাইদের গলার আওয়াজ মিলে যাচ্ছে, হাসি-ঠাট্টা আর গল্পের ফুলঝুরিতে দীর্ঘ পথ কখন যে ফুরিয়ে গেল টেরই পেলাম না। দুপুর একটা বিশ মিনিটে লাকসাম উপজেলার সমশেরপুর গ্রামে পা রাখলাম আমরা। ইসরাত আপুর চাচাতো ভাই আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন। আমাদের দেখেই হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। এই যে অতিথিপরায়ণতা, যেটা বাংলার মাটির এক চিরন্তন স্বভাব, সেটা দেখে মনের মধ্যে এক অদ্ভুত তৃপ্তি জেগে উঠল। ?আজ শুক্রবার। সমশেরপুর গ্রামের মসজিদে আমরা পাঁচজন জুমার নামাজ আদায় করলাম। গ্রামের মসজিদের ভেতরে একটা আলাদা আধ্যাত্মিক শান্তি থাকে; শহরের মসজিদে যে একধরনের যান্ত্রিক ব্যস্ততার গন্ধ, এখানে তা একেবারেই নেই। পাকা দেয়াল, পুরনো সিলিং পাখা আর অচেনা মুসল্লিদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানোর মধ্যে এক অপার্থিব সমতার অনুভব কাজ করে। নামাজ শেষে ইসরাত আপুর বাড়িতে গেলাম। প্রথমেই শরবত আর মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন। তারপর মধ্যাহ্নের খাবার। গ্রামের বিয়েবাড়ির খাবারের কথা আসলে আলাদা করে বলে বোঝানো কঠিন, এটা শুধু খাওয়া নয়, এটা একটা অভিজ্ঞতা। বড় পাতে পরিবেশন করা হলো ধোঁয়া ওঠা ভাত, গরুর মাংসের ভুনা, মাছের ঝোল আর মুরগির ভুনা। গরুর মাংসের টুকরোগুলো এত নরম ছিল যে চামচের সামান্য ছোঁয়াতেই ভেঙে যাচ্ছিল, আর মশলার সুগন্ধে আপনাতেই চোখ বুজে আসে। মুরগির ভুনায় কাঁচামরিচ আর দারুচিনির সেই চিরচেনা সুবাস এই খাঁটি স্বাদ শহরের কোনো দামি রেস্তোরাঁয় মেলে না।

মেলে শুধু ভালোবাসা দিয়ে রান্না করা গ্রামের ঘরের হাঁড়িতে।

দুপুরে খাওয়ার পর বাড়ির চারপাশটা একটু ঘুরে দেখলাম। প্রকৃতি এখানে উদার হস্তে সাজিয়েছে নিজেকে। বাড়ির পাশ ঘেঁষেই বয়ে গেছে ডাকাতিয়া খাল। কিন্তু বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল এটা ভেবে যে, সেই খালের পানিতে এখন কচুরিপানার এক বিশাল সবুজ চাদর বিছিয়ে আছে। জলের রং বড় মলিন। একসময় এই নদীখালগুলোই ছিল গ্রামবাংলার মূল প্রাণ, মাছের সংসার, নাবিকের পথ। আজ সেই প্রাণ হারিয়ে যাচ্ছে অযতেœ, অবহেলায়। সরকারি উদ্যোগ লাগবে, এটা সত্য। তবে যার বাড়ির সামনের অংশটুকু, সে যদি নিজে একটু পরিষ্কার রাখার সংকল্প করত, তাহলেও হয়তো চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন হতো। কিন্তু সেই সামষ্টিক দায়িত্ববোধটুকু যেন ধীরে ধীরে আমাদের সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এটা শুধু এই সমশেরপুর গ্রামের কথা নয়, এটা যেন সারা বাংলাদেশেরই একটা বেদনার্ত প্রতিচ্ছবি। তবু হতাশায় মন বেশিক্ষণ ডুবে থাকেনি, কারণ সামনেই ছিল শহিদ উসমান হাদি সেতু। সেতুর ওপর দাঁড়াতেই হু হু করে বাতাস এলো ঠান্ডা, শীতল, মনকে নিমেষেই ধুয়ে দেওয়া বাতাস। ভরপেট খাওয়ার পর সেই বাতাসের স্পর্শে যে প্রশান্তি নেমে এলো, তার কোনো তুলনা হয় না। মনে হলো যেন কোনো এক অদৃশ্য বাগানে বসে আছি, যেখানে ফুল নেই কিন্তু সুবাস আছে, দৃশ্য নেই কিন্তু অনুভব আছে। আমরা পাঁচজন সেতুর রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ। কেউ কোনো কথা বলছিলাম না, শুধু চারপাশটাকে অনুভব করছিলাম। কখনো কখনো নীরবতাই সবচেয়ে বড় ও গভীর কথা বলে। সেখানে ছবিও তুললাম অনেক। সেই ছবিগুলো শুধু স্মৃতির কোনো স্মারক নয়, এগুলো হলো বলে দেওয়া কয়েকটা মুহূর্তের দলিল এই মুহূর্তে আমরা বেঁচে ছিলাম, আমরা খুব খুশি ছিলাম।

বিকেল তিনটা পঞ্চাশ। ইসরাত আপুকে বিদায় জানাতে গেলাম। গিয়ে দেখি, বরপক্ষের লোকজন ততক্ষণে এসে গেছেন। বর যাকে আমরা আপন করে দোলাভাই বলে ডাকলাম, তিনিও উপস্থিত। দোলাভাইয়ের সঙ্গে পাঁচজন মিলে ছবি তুললাম, কথা বললাম। বিয়ের এই আনন্দে মুখর পরিবেশে নিজেদের আলাদা করে চেনানোর একটা ছোট্ট চেষ্টা ছিল আমাদের মাঝে, ‘আমরা ইসরাত আপুর লেখক পরিবারের মানুষ।’ ইসরাত আপু আমাদের দেখে হাসলেন। সেই হাসিতে খুশি ছিল, কৃতজ্ঞতা ছিল, আর ছিল একটুখানি ভেজা আর্দ্র ভাব। বিদায়ের সময় মানুষের মুখ কথা বলে না, চোখ কথা বলে। আপুর সেই চোখ দুটো যেন নিঃশব্দে বলছিল, ‘তোমরা এলে, এটাই অনেক।’ আমরা বিদায় নিলাম। কিন্তু ফেরার পথে বারবার মনে হলো, সমশেরপুরের বাতাসে কোথায় যেন একটা মায়ার সুতো রেখে আসলাম। ফেরার পথে পরিকল্পনা হলো, ইসরাত আপু যে কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়েছেন, সেই ঐতিহাসিক ‘নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী কলেজ ও জাদুঘর’ দেখে যাব। একটি সিএনজিতে চেপে যখন সেখানে পৌঁছলাম, ঘড়িতে তখন বিকাল চারটা ত্রিশ। কলেজের মাঠে ঢুকতেই একটা অন্যরকম আবেশ। বিকালের নরম রোদে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মানুষ কেউ বসে গল্প করছে, কেউ আপনমনে হাঁটছে, কেউ শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। এই শুক্রবারের বিকালটা যেন তাদের একান্ত নিজস্ব।

একদল বালক ফুটবল নিয়ে মেতে উঠেছে মাঠের একপাশে। তাদের দেখে আমি আর তামিম নিজেদের আর আটকে রাখতে পারলাম না। নিজেদের হারিয়ে যাওয়া শৈশবের ডাক শুনলাম যেন। সোজা দলে ভিড়ে গেলাম। আমার দলে নিলাম মোহনকে, তামিম নিল লাবিবকে। মাঠে তখন বয়সের কোনো ভেদ নেই, পেশার কোনো অহংকার নেই, শুধু বলের পেছনে উদ্দাম দৌড়ানো আর বাঁধভাঙা হাসির শব্দ। দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ বুঝলাম, আসরের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। কান পাততেই শুনলাম, নওয়াব ফয়জুন্নেসা জামে মসজিদ থেকে ভেসে আসছে সুমধুর আজানের ধ্বনি। এই মসজিদটি ১৯০৩ সালে নির্মাণ করেছিলেন স্বয়ং নওয়াব ফয়জুন্নেসা। তার জীবনের শেষ বছরেই তিনি এটি তৈরি করিয়েছিলেন। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে প্রথমবার যখন তাকালাম, বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। বাইরের গম্বুজ আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক যেন পরম করুণাময়ের দরবারে তোলা প্রার্থনারত হাত। মোগল স্থাপত্যের নিখুঁত আদলে নির্মিত এই মসজিদের দেয়ালে আরবেস্ক কারুকাজ, খিলানের ভেতরে আলোর নরম বিচ্ছুরণ। (চলমান)

লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!