ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মেঘনার নীল জল ও ব্রহ্মপুত্রের তীরে ক্যাম্পিং

মিনহাজুর রহমান নয়ন
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ০১:৪৬ এএম

শহরের যান্ত্রিক খাঁচায় বন্দি আমাদের প্রতিটি দিন যেন একঘেয়েমির নীল নকশায় আঁকা। সকালের অ্যালার্ম থেকে শুরু করে রাতের ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস-এর মাঝে আমরা ভুলে যাই মাটির সোঁদা গন্ধ কিংবা নদীর বিশালতা। কিন্তু নাগরিক কোলাহলের খুব কাছেই যেখানে আকাশ এসে মেশে স্বচ্ছ নীল জলরাশিতে, সেই চৌদ্দার চর আর পুরোনো ব্রহ্মপুত্রের তীরে রিবেরেনো অ্যাডভেঞ্চার যেন এক পশলা বৃষ্টির মতো প্রশান্তি নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। আপনার এই যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের যাত্রাটি হতে পারে ঠিক এমন:

ভোরের কুয়াশা মোড়ানো ঢাকা শহর যখন কেবল জেগে উঠছে, তখনই আপনি বেরিয়ে পড়বেন এক অজানার উদ্দেশ্যে। সায়েদাবাদ বা গুলিস্তান থেকে বাসে উঠে যখন জানালার পাশে বসবেন, দেখবেন ব্যস্ত শহরটা ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যাচ্ছে। মদনপুর ছাড়িয়ে আড়াইহাজারের মেঠো পথ ধরে সিএনজিতে যাওয়ার সময় দুপাশের সবুজ প্রকৃতি আপনার চোখে প্রশান্তির প্রলেপ বুলিয়ে দেবে। এই যাত্রাটুকু কেবল পথের দূরত্ব ঘোচানো নয়, বরং নাগরিক ব্যস্ততা থেকে আপনার আত্মার মুক্তি।

আড়াইহাজার ঘাটে পৌঁছে যখন আপনি ট্রলারে পা রাখবেন, তখনই বুঝবেন কেন মেঘনা এত মোহনীয়। ইঞ্জিনের ছন্দময় শব্দের সঙ্গে ট্রলার যখন নদীর বুক চিরে এগোতে থাকবে, ওপারের দিগন্ত জোড়া বালুচর আপনার চোখের সামনে এক রূপকথার জগতের মতো ভেসে উঠবে। ৩.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই চরে পা রাখা মাত্রই আপনার মনে হবে আপনি এক বিশাল নির্জন দ্বীপের অধিপতি। পায়ের নিচে শক্ত বালি আর মাথার উপরে অবারিত নীল আকাশÑ এখানে কোনো সময়সীমা নেই, নেই কোনো ফাইল বা ইমেলের তাড়া। চরের বুক চিরে হাঁটতে হাঁটতে আপনি দেখা পাবেন দিগন্ত বিস্তৃত হলুদ সরিষা খেতের, যেখানে মৌমাছির গুঞ্জন আর ফুলের ঘ্রাণ আপনাকে মাতাল করে দেবে। স্বচ্ছ নীলাভ জলের কাছে গিয়ে যখন দুহাত বাড়িয়ে দেবেন, মেঘনার সেই শীতল পরশ মুহূর্তেই আপনার শরীরের সব ক্লান্তি শুষে নেবে। এখানে জল ঘোলা হওয়ার ভয় নেই, নেই চোরাবালির শঙ্কা; তাই ইচ্ছেমতো জলকেলি করে ফিরে যেতে পারেন সেই শৈশবের দিনগুলোতে।

মেঘনার এই নির্জনতা উপভোগ শেষে বিকেলে আপনার গন্তব্য হবে বন্দর উপজেলার মুসাপুর ইউনিয়নের চর ইসলামপুর। সেখানে পুরোনো ব্রহ্মপুত্র নদের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা ‘রিবেরেনো অ্যাডভেঞ্চার’ আপনার জন্য অপেক্ষায় আছে এক ভিন্নধর্মী রোমাঞ্চ নিয়ে। নদীর তীরে সারিবদ্ধ তাঁবু আর কায়াকিংয়ের আনন্দ আপনার ভ্রমণের মাত্রা বদলে দেবে। পড়ন্ত বিকেলে ব্রহ্মপুত্রের শান্ত জলে কায়াকিং করতে করতে সূর্যাস্ত দেখা এক অপার্থিব অনুভূতি। পানির খুব কাছ থেকে প্রকৃতিকে দেখার এই সুযোগ নাগরিক জীবনে মেলাই ভার।

যান্ত্রিক শহর থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হতে চাইলে এই নদীর পাড়ে একটি রাত যাপনের রোমাঞ্চ কোনোভাবেই মিস করা যাবে না। যখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে আসবে, কেবল নদীর ঢেউয়ের শব্দ আর খোলা আকাশের নিচে হাজার হাজার তারার মেলা আপনার সামনে হাজির হবে, তখন মনে হবে ব্রহ্মা-ের সব শান্তি যেন এখানেই লুটিয়ে আছে। বন্ধুদের সঙ্গে ক্যাম্পফায়ারের টিমটিমে আলোয় শীত তাড়ানো, সঙ্গে ব্যাডমিন্টন বা ক্যারম খেলে মেতে ওঠা আর সেই আলোতে ঝলসানো বারবিকিউর স্বাদ আপনাকে নিয়ে যাবে এক অকৃত্রিম আনন্দে। পরিবারের সঙ্গে এলেও এখানে পাবেন পূর্ণ নিরাপত্তা আর ঘরোয়া খাবারের স্বাদ।

পরদিন সকালে তাবুর জিপার খুলে যখন আপনি ভোরের প্রথম সূর্যোদয় দেখবেন, তখন মনে হবে আপনি এক নতুন পৃথিবীতে জেগে উঠেছেন। সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়বে এবং মেঘনার জল রাঙা হয়ে উঠবে গোধূলির আভায়, তখন আপনার ফেরার পালা। ট্রলারে বসে যখন চরের সেই মায়াবী রূপকে পেছনে ফেলে আসবেন, তখন আর সেই পুরোনো দীর্ঘশ্বাসটি আপনার কণ্ঠে থাকবে না। বরং এক বুক সতেজতা আর প্রশান্তি নিয়ে আপনি শহরে ফিরবেন, যেখানে যান্ত্রিকতা হয়তো অপরিবর্তিত থাকবে, কিন্তু আপনার দেখার দৃষ্টি বদলে যাবে চিরতরে। চৌদ্দার চর আর রিবেরেনো অ্যাডভেঞ্চার কেবল ভ্রমণের জায়গা নয়, এটি যান্ত্রিক শহরের ক্লান্ত মানুষের জন্য এক চিমটি বেঁচে থাকার রসদ।