বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি মানেই পাহাড়, ঝরনা ও মেঘের নিবিড় সহাবস্থান। এই নিবিড়তার শিখরে পৌঁছাতে হলে আপনাকে যেতে হবে বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলায় অবস্থিত কেওক্রাডং পাহাড়ে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,১৭২ ফুট উচ্চতার এই পর্বতটি এক সময় দেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হতো। তবে আধুনিক পরিমাপে এর অবস্থান বর্তমানে পঞ্চম হলেও, পর্যটকদের কাছে এর আকর্ষণ ও গুরুত্ব এখনো প্রথম সারিতে। মারমা ভাষায় ‘কেওক্রাডং’ শব্দের অর্থ হলো সবচেয়ে উঁচু পাথরের পাহাড়। এই নামের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায় যখন কেউ এর খাড়া পাথুরে ঢাল বেয়ে চূড়ায় পৌঁছান।
কেওক্রাডং ভ্রমণের প্রাথমিক ধাপ শুরু হয় বান্দরবান শহর থেকে। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বান্দরবানে পৌঁছানোর পর আপনাকে পাহাড়ের গভীর জনপদে প্রবেশের প্রস্তুতি নিতে হবে। বান্দরবান থেকে কেওক্রাডংয়ের দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। এক সময় এই পথটি ছিল অত্যন্ত দুর্গম, যা কেবল পায়ে হেঁটে অতিক্রম করা সম্ভব ছিল। তবে বর্তমানে রুমা বাজার এবং বগালেক হয়ে কেওক্রাডং পর্যন্ত যাতায়াতের রাস্তা প্রস্তুত হয়েছে। এখানে যাতায়াতের জন্য প্রধান বাহন হলো স্থানীয় জিপ বা চান্দের গাড়ি। বান্দরবান শহর থেকে সরাসরি গাড়ি রিজার্ভ করে কেওক্রাডং যাওয়া সম্ভব। তবে খরচ কিছুটা কমাতে চাইলে প্রথমে লোকাল বাসে রুমা বাজার পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে নতুন করে গাড়ি বা মোটরবাইক ভাড়া করে নেওয়া যায়। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা ও খাড়া
রাস্তায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে ভাড়ার বিষয়টি মূলত সিজন এবং পর্যটকদের চাহিদার ওপর নির্ভর করে, তাই স্থানীয় চালকদের সঙ্গে কথা বলে দরদাম করে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও গাইড নির্বাচন
রুমা বাজার হলো কেওক্রাডং ভ্রমণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র। এখান থেকেই কেওক্রাডং যাত্রার আনুষ্ঠানিক অনুমতি নিতে হয়। পাহাড়ি এলাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক। নিবন্ধিত গাইড সমিতির অফিস থেকে একজন গাইড ঠিক করে নেওয়ার পর রুমা বাজার আর্মি ক্যাম্পে ভ্রমণকারীদের নাম, ঠিকানা এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি জমা দিয়ে অনুমতি নিতে হয়। গাইড আপনাকে কেবল পথই দেখাবে না, বরং যাত্রাপথের নিরাপত্তা এবং থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেও সহায়তা করবে। রুমা বাজার থেকেই প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার বা জরুরি ওষুধ কিনে নেওয়া ভালো, কারণ ওপরের গ্রামগুলোতে বাজারের মতো সুবিধা পাওয়া যায় না।
বগালেক
কেওক্রাডং যাওয়ার পথে প্রথম বড় বিরতি হলো বগালেক। প্রায় ১২০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই প্রাকৃতিক হ্রদটি পর্যটকদের কাছে বড় বিস্ময়। পাহাড়ের ওপর এমন স্বচ্ছ নীল জলের আধারের অবস্থান ভূতাত্ত্বিক দিক থেকেও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। সাধারণত পর্যটকরা যাত্রার প্রথম রাতটি বগালেকের পাশে আদিবাসীদের মাচাং কটেজে কাটান। বগালেকের শান্ত পরিবেশ আর পাহাড়ি জীবনযাত্রা পরবর্তী দিনের দীর্ঘ পাহাড় আরোহণের ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে।
আরোহণ ও পারিপার্শ্বিক জনপদ
বগালেক থেকে কেওক্রাডং চূড়া পর্যন্ত এখন গাড়ির রাস্তা রয়েছে। তবে যারা পাহাড়ের আসল স্বাদ নিতে চান, তারা বগালেক থেকে ৩-৪ ঘণ্টার ট্রেকিং পথটি বেছে নেন। এই পথে যেতে যেতে দেখা মেলে মুনলাইপাড়া এবং দার্জিলিংপাড়ার মতো পরিচ্ছন্ন সব পাহাড়ি গ্রাম। বম সম্প্রদায়ের এই গ্রামগুলো তাদের শৃঙ্খলা এবং আতিথেয়তার জন্য পরিচিত। বিশেষ করে দার্জিলিংপাড়া থেকে কেওক্রাডংয়ের চূড়াটি খুব কাছে দৃশ্যমান হয়। এই পথে হাঁটলে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে মেঘেদের আনাগোনা আর বুনো প্রকৃতির গম্ভীর রূপ চোখের সামনে ফুটে ওঠে।
চূড়ায় রাতযাপন ও আহার
কেওক্রাডং ভ্রমণের পূর্ণতা আসে যদি এর চূড়ায় অন্তত এক রাত অবস্থান করা যায়। চূড়ায় থাকার জন্য আদিবাসীদের তৈরি বেশ কিছু কটেজ এবং একটি সাধারণ মানের হোটেল রয়েছে। এখানে সমতলের মতো বিলাসবহুল সুবিধা নেই, তবে পাহাড়ের চূড়ায় রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা অন্য যেকোনো বিলাসের চেয়েও বেশি পাওয়া। চূড়ায় খাবারের জন্য নির্দিষ্ট কিছু আদিবাসী হোটেল আছে। সেখানে জুমের চালের ভাত, পাহাড়ি মুরগির মাংস, ভর্তা এবং সবজির সমন্বয়ে ঘরোয়া প্যাকেটজাত খাবার পাওয়া যায়। খাবারের চাহিদা অনুযায়ী আগেভাগে অর্ডার দিয়ে রাখা ভালো। পাহাড়ের চূড়া থেকে সূর্যাস্ত এবং পরদিন ভোরে মেঘের সমুদ্র ভেদ করে সূর্যোদয় দেখার সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়।
প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সতর্কতা
সরঞ্জাম : পাহাড় আরোহণের জন্য ভালো গ্রিপের জুতা ব্যবহার করা অপরিহার্য। ব্যাগের ওজন যতটা সম্ভব কম রাখা উচিত।
বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক : বগালেক ও কেওক্রাডংয়ে গ্রিড বিদ্যুৎ নেই, সোলারের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই পর্যাপ্ত
চার্জসহ পাওয়ার ব্যাংক রাখা জরুরি। নেটওয়ার্কের জন্য রবি বা টেলিটক সংযোগ তুলনামূলক কার্যকর।
পরিবেশ ও সংস্কৃতি : স্থানীয় আদিবাসীদের জীবনযাত্রা ও গোপনীয়তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন। প্লাস্টিক বা অপচনশীল বর্জ্য ফেলে পাহাড়ের সৌন্দর্য নষ্ট করবেন না।
নিরাপত্তা : প্রতিটি চেকপোস্ট বা ক্যাম্পে রিপোর্ট করার বিষয়টি নিশ্চিত করুন। পাহাড়ের ঢাল বা বগালেকের জলে নামার সময় অতিরিক্ত ঝুঁকি নেবেন না।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন