সকাল থেকে ঢাকা শহর যখন ধুলোবালি আর যান্ত্রিকতা দিয়ে শুরু করে দিন, ঠিক তখনই এই শহরের কাছেই ৩৫ কিলোমিটার দূরে এক গ্রাম্যবধূর মতো শান্ত হয়ে বসে আছে সিন্দুরিয়া। পাখিদের অভ্রায়নখ্যাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব কাছেই এই গ্রামটি যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস, যেখানে শিল্পী তার তুলি দিয়ে এঁকেছেন।
মায়াবী ভোরে যাত্রা
কোনো এক সকালে ঢাকার ঘিঞ্জি গলি ছাড়িয়ে নবীনগর যখন পার হলেই লক্ষ্য করবেন মাটির একটু ঘ্রাণ নাকে আসছে, গেরুয়া মোড় থেকে ইজিবাইকে করে যখন সিন্দুরিয়ার মেঠো পথে পা রাখবেন, মনে হবে যেন আপনে নব্বই দশকে ফিরে গেলেন। রাস্তার দু-পাশে ধানখেত আর দূরে ধলেশ্বরীর রুপালি রেখা; এতক্ষণ যে ক্লান্তি নিয়ে আসলেন মুহূর্তেই ধুয়ে মুছে দেবে চোখের সামনের ক্যানভাস।
নদী ও পাখিদের শহর
গ্রামের ভেতরে পা রাখতেই কানে এলো এক সমবেত গুঞ্জন। না, মানুষের কোলাহল নয়, হাজারো ডানা ঝাপটানোর সুর। সিন্দুরিয়ার সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলোÑ এখানকার আকাশছোঁয়া নারিকেল গাছগুলো। গাছগুলোর দিকে তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়। শত শত বাবুই আর মুনিয়া পাখি সেখানে তাদের নিপুণ কারুকাজে ঘর বেঁধেছে। মাত্র ৪০০ মিটারের এক নারিকেল বাগানে ৩০০-এর বেশি পাখির বাসা! বাতাস যখন বয়, নারিকেল পাতার সঙ্গে সেই বাসাগুলো দোল খায়। মনে হয় যেন নারিকেল পাতায় ঝুলে আছে শত শত পাখির বোনা কোনো গোপন স্বপ্ন। সিন্দুরিয়া গ্রামটি যেন ধলেশ্বরী আর বংশী নদীর এক আদরের সন্তান। বর্ষায় এই গ্রাম এক অন্য রূপ নেয়। বন্যার পানি যখন মিরেরটেক আর সিন্দুরিয়ার বুক ছুঁয়ে যায়, তখন পুরো এলাকা এক জলজ স্বর্গে পরিণত হয়। নদীর পাড়ে বসে দেখা যায় সরালি আর পানকৌড়ির ডুবসাঁতার। সাদা-গলা মাছরাঙার ছোঁ মেরে মাছ ধরা দেখলে মনে হয়, পৃথিবীর সব সৌন্দর্য এখানেই বুঝি জমা হয়েছে।
বুনো প্রাণের গোপন আস্তানা
গল্পটা শুধু পাখিদের নয়। সিন্দুরিয়ার ঝোপঝাড়ে কান পাতলে শোনা যায় বুনো ঘ্রাণ। নিঝুম দুপুরে এখানে এখনো দেখা মেলে ছোট ছোট গন্ধগোকুল আর মেছো বিড়ালের। ভাগ্য ভালো থাকলে ঝোপের ভেতর দিয়ে সোনালি শিয়ালের লুকোচুরিও চোখে পড়ে। ১৫ প্রজাতির সরীসৃপ আর অসংখ্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর এই সংসারটি আজও টিকে আছে এখানকার মানুষের সহজ সরল জীবনযাত্রার কারণে।
আগামীর শঙ্কা
বিকেলের আলো যখন নদীর জলে চিকচিক করছিল। শহুরে দূষণ আর রেস্টুরেন্টের চটকদার আলো এখন এই শান্ত গ্রামটির দিকে হাত বাড়াচ্ছে। প্লাস্টিকের বোতল আর চিপসের প্যাকেট এখন মাঝে মাঝে ধলেশ্বরীর স্বচ্ছ জলে ভেসে ওঠে, যা এই অঞ্চলের সূক্ষ্ম বাস্তুতন্ত্রের জন্য এক অশনিসংকেত।
কখন যাবেন : বর্ষার শেষ দিকে বা শরতের পড়ন্ত বিকেলে সিন্দুরিয়া সবচেয়ে সুন্দর। তবে শীতের ভোরে অতিথি পাখিদের মেলা দেখতে যাওয়াটাও হবে দারুণ।
কী দেখবেন : প্রথমেই চলে যান সেই নারিকেল বাগানে। এরপর নদীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে চলে যান মিরেরটেকের দিকে। সময় থাকলে একটা নৌকা ভাড়া করে ধলেশ্বরীর বুকে ভেসে বেড়াতে পারেন ঘণ্টাখানেক।
কী খাবেন : বাজারের ছোট দোকানে বসে ধোঁয়া ওঠা চা আর টাটকা পিঠা। খুব বেশি চাকচিক্য নেই, কিন্তু আছে গ্রামের অনুভূতি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন