পুরোনো মাঝিদের মুখে শোনা যায় এক অদ্ভুত কাহিনি। একসময় বর্ষার ভরা যৌবনে যখন ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যা ফুঁসত, তখন এই চরের সীমানা বোঝা দায় হয়ে পড়ত। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে জেলেরা মাছ ধরতে এসে দিক হারিয়ে ফেলতেন। তারা মনে করতেন, দ্বীপটি যেন কোনো এক মায়াবী জাদুকরের তৈরি করা গোলকধাঁধা, যা মাঝনদীতে পথ আগলে দাঁড়ায়। সেই থেকেই এর নাম হয়েছে ‘ধাঁধার চর’। কথিত আছে, সুলতানি আমলে এই নির্জন চরটি ছিল নৌ-সেনাদের বিশ্রামের আস্তানা। আজ সেখানে কোনো তলোয়ারের ঝনঝনানি নেই, আছে শুধু বুনো লতা আর ঝোপঝাড়ের নিচে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস।
সবুজ আর জলের মিতালি
ধাঁধার চরে পা রাখলেই আপনার মনে হবে আপনি কোনো এক বিশাল প্রাকৃতিক উদ্যানে চলে এসেছেন। চরের একপাশে তাকালে দেখবেন শীতলক্ষ্যার কাঁচের মতো টলটলে শান্ত জল, আর অন্যপাশে প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্রের গাম্ভীর্য। দুই নদীর দুই রকম মেজাজ এক জায়গায় বসে দেখা সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। এখানে নাগরিক কোলাহল নেই, আছে শুধু পাখির কিচিরমিচির আর দিগন্তজোড়া সবুজের সমারোহ। বিকেলে যখন তপ্ত সূর্যটা ব্রহ্মপুত্রের বুক চিরে রক্তিম আভা ছড়িয়ে ডুবে যায়, তখন মনে হবে সময়টা যেন থমকে গেছে।
স্বপ্নের পর্যটন কেন্দ্র
ধাঁধার চর নিয়ে এখন নতুন স্বপ্ন দেখছে সরকার। পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে একে একটি ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানা যায়। পর্যটকদের জন্য তৈরি হচ্ছে আধুনিক ল্যান্ডিং স্টেশন বা ঘাট। খুব শিগগিরই এটি হতে যাচ্ছে ঢাকার খুব কাছের সবচেয়ে জনপ্রিয় উইকেন্ড ট্যুরিস্ট স্পট। চরের এই নিস্তব্ধতা হয়তো অচিরেই আধুনিক পর্যটনের ছোঁয়ায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।
দুই নদীর মোহনার দৃশ্য
এই চরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর অবস্থান। চরের একপাশে শীতলক্ষ্যা নদীর শান্ত ও স্বচ্ছ জলরাশি, আর অন্যপাশে ব্রহ্মপুত্র নদের বিশালতা ও গাম্ভীর্য। দুই নদীর মিলনস্থলে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির দুই ভিন্ন রূপ দেখা এক অনন্য অভিজ্ঞতা। পলি জমে তৈরি হওয়া এই দ্বীপটি এখন একটি বিশাল প্রাকৃতিক উদ্যানে রূপ নিয়েছে। চরের বুকে রয়েছে নানা প্রজাতির গাছপালা, বনজ লতাগুল্ম এবং কাশবন (ঋতুভেদে)। নাগরিক কোলাহলমুক্ত এই সবুজ আপনাকে এক নিমেষে প্রশান্তি দেবে। নদীবেষ্টিত এবং নির্জন হওয়ায় এখানে প্রচুর পাখির আনাগোনা থাকে। বিশেষ করে শীতকালে অতিথি পাখির দেখা মিলতে পারে। আর সারা বছর দেশি হরেক প্রজাতির পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত থাকে পুরো চর। চরের চারপাশের পানি বেশ স্বচ্ছ। ট্রলার বা নৌকা নিয়ে চরের চারপাশে ঘুরে বেড়ানোর সময় পানির নিচের বালু বা মাছের খেলা দেখাও অনেক সময় সম্ভব হয়। নৌকায় বসে সূর্যাস্ত দেখা এখানকার অন্যতম সেরা দৃশ্য।
গ্রামীণ পরিবেশ ও জেলেদের জীবন
এখানে কোনো যান্ত্রিক যান নেই, নেই কোনো স্থায়ী জনবসতির কোলাহল। আপনি যদি নিরিবিলি সময় কাটাতে চান, তবে চরের নির্জনতা আপনার খুব ভালো লাগবে। চরের বালুকাময় সৈকতে হাঁটলে মনে হবে আপনি কোনো সমুদ্র সৈকতের একান্তে আছেন।
নদীর মোহনা হওয়ায় এখানে স্থানীয় জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য দেখা যায়। তাদের ঐতিহ্যবাহী জাল ফেলা এবং নৌকায় জীবনযাপনের চিত্র গ্রাম-বাংলার এক চিরায়ত রূপ মনে করিয়ে দেয়।
দুপুরের আয়োজন
চরের নির্জনতায় বসে বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে বনভোজনের আনন্দ নিতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, খাবার এবং পানি অবশ্যই সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে, কারণ চরে এখনো কোনো বাণিজ্যিক হোটেল গড়ে ওঠেনি।
শীতলক্ষ্যার বুকে জেগে থাকা এই রহস্যময় ‘ধাঁধা’ এখন আধুনিকতার পরশে উন্মোচিত হওয়ার অপেক্ষায়। আপনি যদি ভিড় এড়িয়ে নিরিবিলি একটি দিন কাটাতে চান, তবে একদিনের ছুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। ধাঁধার চরের নির্জনতা আপনার মনের সব জট খুলে দেবেÑ এটুকু নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
কীভাবে যাবেন
খুব সকালে ঢাকা থেকে বাসে বা ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ে বসুন। গন্তব্য গাজীপুরের কাপাসিয়া। কাপাসিয়া পৌঁছেই শীতলক্ষ্যার ঘাট থেকে একটা ইঞ্জিনচালিত ট্রলার বা নৌকা ভাড়া করে নিন। নদীর বুক চিরে চরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় যে হিমেল হাওয়া আপনাকে ছুঁয়ে যাবে, তাতেই আপনার অর্ধেক ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে।

