ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মহামায়া লেকের মায়ায়

মেহরুন নিশি
প্রকাশিত: মে ৯, ২০২৬, ০১:৩৭ এএম

প্রকৃতির সান্নিধ্য মানুষের নাগরিক ক্লান্তি মোচনের শ্রেষ্ঠ দাওয়াই।  সেই প্রকৃতি যদি হয় পাহাড় এবং টলটলে জলের নিবিড় মিতালী, তবে তো কথাই নেই। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার পাহাড়ের কোলে শুয়ে থাকা মহামায়া লেক ঠিক তেমনই স্থান, যেখানে নীল জলরাশি এবং সবুজ পাহাড়ের আলিঙ্গন দেখে মুহূর্তেই চোখ জুড়িয়ে যায়। এই লেক শুধু একটি কৃত্রিম হ্রদ নয়, বরং যান্ত্রিকতা থেকে দূরে নির্জনতায় কিছুকাল কাটানোর জন্য অনন্য আশ্রয়স্থল। ১১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই লেকটি শান্ত শীতল পরিবেশ ও চারপাশের অরণ্যের মায়াবী হাতছানিতে পর্যটকদের হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত মহামায়া লেক বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ। পাহাড়ের পাদদেশে বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে তৈরি হওয়া এই বিশাল জলরাশি এখন পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। লেকের চারপাশে থাকা পাহাড়গুলো যেন অতন্দ্র প্রহরীর মতো জলরাশিকে আগলে রেখেছে। হ্রদের স্বচ্ছ পানিতে পাহাড়ের ছায়া ও নীল আকাশের প্রতিফলন যে দৃশ্যের অবতারণা করে, তা যেকোনো চিত্রকর্মের চেয়েও জীবন্ত। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে থাকা এই লেকের পানির একটি বড় অংশ স্থানীয় কৃষিজমির সেচ কাজেও ব্যবহৃত হয়, যা এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে উপযোগিতার দারুণ সমন্বয় ঘটিয়েছে।

মহামায়া লেকের আসল রূপ উপভোগ করতে হলে আপনাকে ভাসতে হবে স্থির জলবক্ষে। লেকে ঘুরে বেড়ানোর জন্য রয়েছে সুব্যবস্থিত ইঞ্জিনচালিত বোট। বোটে চড়ে লেকের গহিন অংশে প্রবেশের সময় দুই পাশের পাহাড়ের নিস্তব্ধতা ও পাখির কলতান আপনাকে দেবে অপার্থিব অনুভূতি। যারা রোমাঞ্চপ্রিয়, তাদের জন্য এখানে রয়েছে কায়াকিং করার সুবর্ণ সুযোগ। লেকের শান্ত পানিতে নিজের হাতে বৈঠা চালিয়ে কায়াকিং করা বর্তমান প্রজন্মের পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। সাধারণত সকাল ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত এখানে কায়াকিং করা যায়। শিক্ষার্থী ও দলগত পর্যটকদের জন্য এখানে প্রায়শই বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা থাকে। ঢেউহীন জলে কায়াকের ওপর বসে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার অভিজ্ঞতা দীর্ঘকাল স্মৃতিতে অমলিন থাকে।

মহামায়া লেকের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো গহিনে লুকিয়ে থাকা ঝর্ণা। বোটে করে লেকের শেষ প্রান্তে পৌঁছালে দেখা মেলে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা শীতল পানির ধারা। ঝর্ণার স্বচ্ছ পানিতে শরীর ভেজানো কিংবা পাথুরে পাহাড়ের ভাঁজ থেকে গড়িয়ে পড়া পানির শব্দ শোনা বিরল প্রশান্তি দেয়। শুধু ঝর্ণাই নয়, লেকের আশপাশে রয়েছে ছোট ছোট কিছু পাহাড়ি গুহা। প্রাচীন সব রোমাঞ্চের খোঁজে অনেক পর্যটকই এই গুহাগুলো দেখতে যান। এ ছাড়া এখানে রয়েছে একটি সুবিশাল রাবার ড্যাম, যা এই অঞ্চলের সেচ ব্যবস্থায় আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়েছে এবং পর্যটকদের জন্য একটি দর্শনীয় পয়েন্ট হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে।

রাত্রিযাপন

প্রকৃতিকে আরও নিবিড়ভাবে অনুভব করতে চাইলে মহামায়া লেকের পাড়ে তাবু গেড়ে রাত্রিযাপন বা ক্যাম্পিং হতে পারে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। বর্তমানে এখানে পর্যটকদের জন্য ক্যাম্পিংয়ের সুব্যবস্থা করা হয়েছে। পূর্ণিমা রাতে লেকের শান্ত জলে চাঁদের আলোর প্রতিফলন ও পাহাড়ের বুক চিরে আসা বাতাসের শব্দ শুনতে শুনতে ক্যাম্প ফায়ারের আড্ডা যেকোনো ভ্রমণকে পূর্ণতা দেয়। তবে ক্যাম্পিংয়ের ক্ষেত্রে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে নেওয়া প্রয়োজন। মিরসরাই বা সীতাকু- এলাকায় খুব উন্নতমানের আবাসিক হোটেল না থাকলেও, কাছাকাছি সীতাকু- পৌরসভায় কিছু সাধারণ মানের হোটেল রয়েছে। যারা একটু ভালো মানের আতিথেয়তা চান, তারা সীতাকু- বা মিরসরাই ভ্রমণ শেষ করে দেড় ঘণ্টার দূরত্বে চট্টগ্রাম শহরে গিয়ে রাত্রিযাপন করতে পারেন।

যেভাবে যাবেন

মহামায়া লেকের অবস্থান চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ঠাকুরদীঘি বাজার থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার পূর্বে। ঢাকা থেকে বাস কিংবা ট্রেন উভয় পথেই এখানে সহজে আসা সম্ভব। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী যেকোনো বাসে উঠে মিরসরাইয়ের আগে ঠাকুরদীঘি বাজারে নামতে হয়। সেখান থেকে অটোরিকশা বা সিএনজি যোগে সহজেই মহামায়া ইকোপার্কের মূল ফটকে পৌঁছানো যায়। ট্রেনে আসতে চাইলে ফেনী স্টেশনে নেমে লোকাল বাসে ঠাকুরদীঘি আসা সুবিধাজনক। এ ছাড়া মেইল ট্রেনে চিনকি আস্তানা স্টেশনে নেমেও ছোট যানবাহনে লেক পর্যন্ত পৌঁছানো যায়। যাতায়াত ও কায়াকিংয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ভাড়ার চেয়ে দরদাম করে নেওয়া ভালো, কারণ পর্যটন মৌসুমে ভাড়ার তারতম্য হতে পারে।

আশপাশের দর্শনীয় স্থান

মহামায়া লেকের অবস্থান এমন এক স্থানে, যেখান থেকে মিরসরাই ও সীতাকু-ের আরও অনেকগুলো পর্যটন স্পট খুব কাছেই অবস্থিত। পর্যটকরা চাইলে তাদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় খৈয়াছড়া বা নাপিত্তাছড়া ঝর্ণাকে যুক্ত করতে পারেন। এ ছাড়া চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়া, গুলিয়াখালি সি-বিচ কিংবা বাঁশবাড়িয়া ঘাটের সূর্যাস্ত দেখার সুযোগও মহামায়া লেকের খুব কাছেই। সীতাকু-ের ঐতিহ্যবাহী চন্দ্রনাথ মন্দির দর্শন কিংবা কুমিরা সন্দ্বীপ ঘাটের জেটি ভ্রমণ একই যাত্রায় শেষ করা সম্ভব। খাবারের জন্য ঠাকুরদীঘি বা সীতাকু- বাজারের স্থানীয় হোটেলগুলোর সাধারণ অথচ সুস্বাদু পদগুলো আপনার ভ্রমণের ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করবে।

সচেনতা

মহামায়া লেক একটি সংরক্ষিত ইকোপার্ক এলাকা। তাই ভ্রমণের সময় প্লাস্টিক বর্জ্য বা কোনো ময়লা-আবর্জনা লেকের পানিতে বা পাহাড়ে ফেলে পরিবেশ দূষিত করা থেকে বিরত থাকা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। প্রকৃতিকে সুন্দর রাখলে প্রকৃতিই আমাদের প্রতিনিয়ত সতেজ রাখে।