ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সবুজের সাম্রাজ্য শ্রীমঙ্গল

ইয়াছিন ইবনে ফিরোজ
প্রকাশিত: মে ৯, ২০২৬, ০১:৩৮ এএম

এপ্রিলের শেষ রাত। কয়েকদিন ধরে টানা বৃষ্টি ও তীব্র ঝড়ের বাতাস ছিল। তবুও বাতাসে গরমের একটা নিস্তেজ আঁচ লেগে আছে, যদিও রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই আঁচ কিছুটা নরম হয়ে এসেছে। কুমিল্লা শহর তখন ঘুমের কোলে এলিয়ে পড়েছে। দোকানপাটের শাটার নামা, রাস্তায় কুকুরের মাঝেমধ্যে ডাক, আর মাঝে মাঝে রিকশার টুংটাং আওয়াজ ছাড়া বিশেষ কোনো শব্দ নেই। অথচ কুমিল্লা রেলস্টেশনে তখন আলাদা একটা জীবন জেগে উঠেছে। ভোর না হওয়া পর্যন্ত, বেঞ্চে আর মেঝেতে গুটিশুটি শুয়ে থাকে কিছু মানুষ, যাদের আর কোনো আশ্রয় নেই। একটু খেয়াল করলেই চোখে পড়ে, কোণায় ছেঁড়া চট বিছিয়ে ঘুমিয়ে আছে কয়েকটি পথশিশু। তাদের মুখে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু ঘুমের মধ্যে একটা নিষ্পাপ শান্তি। কাছেই ঘুমাচ্ছেন কিছু ঘরবাড়িহীন মানুষ বয়স্ক, ক্লান্ত, জীবনের ভার বহন করতে করতে স্টেশনের মেঝেকেই বিছানা করে নেওয়া। এই দৃশ্য বাংলাদেশের প্রতিটি বড় রেলস্টেশনেই আছে, ঢাকা কমলাপুর থেকে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা থেকে সিলেট, রাতের রেলস্টেশনগুলো এভাবেই হয়ে ওঠে একটা অনিচ্ছুক আশ্রয়। বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরামের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আঠারোজন সদস্য একে একে জড়ো হচ্ছেন প্ল্যাটফর্মে। কলম-হাতের মানুষগুলো আজ কলম রেখে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েছেন। সাবেক সভাপতি ও বর্তমান উপদেষ্টা রাজীব ভাই, বর্তমান সভাপতি মাসুম ভাই, সাধারণ সম্পাদক সাইদুল ভাইসহ এই দলের প্রতিটি মানুষের চোখে একটাই স্বপ্ন, সবুজের রাজ্য শ্রীমঙ্গল। এপ্রিলের শুরুতেই আলোচনার বীজ পড়েছিল মনের জমিনে। সিদ্ধান্ত পাকাপোক্ত হলো, ত্রিশে এপ্রিল দিবাগত রাতে, অর্থাৎ পহেলা মে’র প্রথম প্রহরে, রাত বারোটার ট্রেনে কুমিল্লা থেকে শ্রীমঙ্গলের পথে রওনা হবে। সেমিস্টার ফাইনালের ধকল তখনও চলছে আমার, পরীক্ষা বারবার পিছিয়েছে নানা কারণে, তাতে মানসিক ক্লান্তি আর ঘনীভূত হয়েছে। আমি আর মাসুম ভাই দুজনেই অসুস্থ। তবু ভ্রমণের টানটা এমনই, শরীরের আপত্তিকে মন সবসময় পাত্তা দেয় না। অজানাকে জানার যে তৃষ্ণা, সে তৃষ্ণার কাছে জ্বর-সর্দি বড় তুচ্ছ। সাড়ে এগারোটার মধ্যে সকলে কুমিল্লা রেলস্টেশনে হাজির। পরিচয়পর্ব, সৌজন্যের বিনিময়, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা সব মিটিয়ে প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা। ট্রেন আসার কথা বারোটায়, কিন্তু বাংলাদেশের রেলের নিজস্ব একটা দার্শনিক অবস্থান আছে, সময় তার কাছে আপেক্ষিক। চল্লিশ মিনিট দেরিতে, বারোটা চল্লিশে ট্রেন এলো। বরং মনে মনে কৃতজ্ঞতাই জানালাম। এর চেয়ে অনেক বেশি দেরি করার ইতিহাস আমাদের রেলের আছে।

বাংলাদেশের রাতের ট্রেনে চড়লে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়। চলমান কামরার ঝনঝনানি, চাকার সঙ্গে রেললাইনের ক্রমাগত কথোপকথন, জানালার ফাঁক দিয়ে ভেসে আসা রাতের বাতাস, সবকিছু মিলিয়ে একটা আধঘুমো দুনিয়া তৈরি হয়। আমরা যে যার আসনে বসলাম। সকালে সারাদিন হাঁটতে হবে, তাই শরীরকে একটু বিশ্রাম দেওয়া দরকার। জোর করে চোখ বুজলাম। জানালা দিয়ে রাতের স্বচ্ছ শীতল বাতাস বুকে এসে লাগছে, ভালোই লাগছিল। তারপর হঠাৎ সেই চিৎকার। পাশের সিটের এক মহিলার আর্তনাদে ঘুমের রেশ ভেঙে চুরমার। তার হাতে ধরা ব্যাগ কেউ একজন ট্রেনের উপর থেকে জানালায় হাত ঢুকিয়ে টান দিয়ে নিয়ে গেছে। ব্যাগের ফিতাটা তখনো তার হাতের মুঠোয়, কিন্তু ব্যাগ নেই। প্রায় দশ হাজার টাকা ছিল সেই ব্যাগে। তবু একটা সান্ত¡না, মোবাইলটা তার স্বামীর হাতে ছিল বলে রক্ষা পেয়েছে। পরে জানা গেল, এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সারারাত প্রতিটি বগিতেই এই চোরদের তা-ব চলেছে। একটি বগিতে নাকি চোরেরা টাকা নিয়ে ব্যাগটা ফিরিয়েও দিয়েছে, যেন দয়ার শেষটুকুও দেখাতে চেয়েছে। কিন্তু এই উদারতায় কেউ সান্ত¡না পায় না। এই চোরদের কৌশলটা নির্মম সরল। ট্রেনের ছাদে উঠে জানালা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে টান দেয়, আর ট্রেন কোনো স্টেশনে থামলে বা গতি কমালে নেমে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। ট্রেনে পুলিশ থাকে, কিন্তু ছাদে গিয়ে ধরার সাহস বা উদ্যোগ কারোরই নেই। এই যাত্রীরা তাই কোনোভাবে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারলেই যেন বাঁচেন। উদ্বেগের সেই রাতটা কাটিয়ে প্রায় ভোর চারটায় আমরা শ্রীমঙ্গল স্টেশনে নামলাম।

শ্রীমঙ্গল স্টেশনে নামতেই বোঝা গেল, এখানকার বাতাস আলাদা। একটা মৃদু স্যাঁতসেঁতে সবুজ গন্ধ, যেন পাহাড় আর চা-বাগান মিলে মিশে বাতাসে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। রাতের ক্লান্তি থাকলেও সেই গন্ধ শরীরে একটা অদ্ভুত সজীবতা এনে দেয়। সবাই মিলে প্রথমে ছবি তুললাম, স্টেশনের চারপাশে একটু হাঁটাহাঁটি করলাম। ফজরের আজান শোনা গেল, শ্রীমঙ্গল স্টেশন মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করলাম। ভোরের সেই নামাজে একটা বিশেষ প্রশান্তি ছিল। বাইরের পৃথিবী যখন ঘুমের মধ্যে, মসজিদের ছোট্ট পরিসরে তখন কিছু মানুষ মাথা নত করে আছেন এক অদৃশ্য শক্তির সামনে। নামাজ শেষে চান্দের গাড়ির বন্দোবস্ত হলো। সারাদিনের ভ্রমণের জন্য প্রতিটি গাড়ি চার হাজার টাকায় ভাড়া নেওয়া হলো। আমরা আঠারোজনের জন্য দুটি গাড়ি। চান্দের গাড়ি শ্রীমঙ্গলের অনন্য যানবাহন, যার পেছনে বসে পাহাড়ি পথ পাড়ি দেওয়াটাই একটা আলাদা অভিজ্ঞতা। স্টেশনেই সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। এরপর শুরু হলো সেই দিন, যে দিনটা মনে রাখার মতো।

প্রথম গন্তব্য লাল পাহাড়। নামটা শুনলে মরুভূমির পাথুরে ভূদৃশ্যের কথা মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে সম্পূর্ণ উল্টো। লাল পাহাড়ে পৌঁছে চোখ যেন থমকে যায়। চা-বাগান আর পাহাড় এ দুটি কখন যে পরস্পরের আলিঙ্গনে এতটা সুন্দর হয়ে উঠেছে, তা বলা কঠিন। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা সবুজের ঢেউ, তার মাঝে মাঝে লাল মাটির রং মিলিয়ে একটা প্রাকৃতিক চিত্রকর্ম তৈরি হয়েছে, যা কোনো শিল্পীর তুলিতে ধরা যাবে না। এখানে বানর দেখা গেছে যারা লাফিয়ে লাফিয়ে গাছ থেকে অন্য গাছে যাতায়াত করছে। দূরে কোনো গাছে বসে এক পাখি ডাকছে, তার নাম জানি না, কিন্তু সুর শুনে মনে হলো সে বলছে স্বাগতম। আমাদের মতো অনেক পর্যটক এসেছেন। তারাও ছবি তুলছেন, হাঁটছেন, পাহাড়ের সৌন্দর্যে হারিয়ে যাচ্ছেন। আমরাও যথেষ্ট ছবি তুলে পরের গন্তব্যের দিকে রওনা হলাম।

মাধবপুর লেকের কথা আগে থেকেই শুনেছিলাম। তিন দিকে পাহাড় বেষ্টিত এই হ্রদ নাকি দেখতে অপার্থিব সুন্দর। সেই গল্প কতটা সত্যি তা যাচাই করতে আমরা গেলাম। লেকে ঢোকার প্রবেশমূল্য প্রতি গাড়ি পঁচাত্তর টাকা। কিন্তু আমরা পৌঁছালাম প্রায় সকাল আটটায়, লেক খোলে নয়টায়। এক ঘণ্টা অপেক্ষা করা অবশ্যই সম্ভব, কিন্তু আমাদের সারাদিনে আর ঘোরাঘুরি করতে হবে। তাই টিকিট কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে নির্ধারিত মূল্যের সঙ্গে কিছু বকশিশ দিয়ে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি পাওয়া গেল। বাংলাদেশে এই ব্যবস্থাটাকে অনেকে অনিয়ম বলবেন, অনেকে বলবেন বাস্তবতা। ভেতরে ঢুকতেই বুঝলাম, গল্প মিথ্যে নয়। তিন দিক থেকে পাহাড় এসে যেন লেককে কোলে তুলে নিয়েছে। পাহাড়ের গায়ে চা বাগানের সবুজ সাম্রাজ্য, আর তার প্রতিফলন লেকের শান্ত জলে, এই দৃশ্য দেখে সত্যিই মনে হয়, পৃথিবীতে এমন কিছু জায়গা আছে যেখানে প্রকৃতি নিজেই স্থপতি হয়ে ওঠেছে। লেকের পাড় ধরে হাঁটছি, এর মধ্যে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টিটা ধীরে ধীরে ভারী হলো, তারপর যেন আমাদের কথা মনে করে একটু বিরতি নিল, যাতে আমরা ছবি তুলতে পারি। যাতে স্মৃতিতে জমা রাখতে পারি কিছু ছবি। বৃষ্টির সেই আদুরে বিরতিতে পাহাড়ে উঠলাম। উপর থেকে যা দেখলাম, তার বর্ণনা দেওয়া সত্যিই কঠিন। কাছের পাহাড় আর দূরের পাহাড়, চা বাগানের সবুজ ঢেউ, আর তাদের মাঝখানে স্থির লেকের জল সব মিলিয়ে একটা দৃশ্য যা শুধু চোখ নয়, বুকের গভীরে গিয়ে স্পর্শ করে। এই লেক আর পাহাড়ের বন্ধুত্বটা যেন চিরকালের। পাহাড় যখন গ্রীষ্মের তাপে জ্বলে, লেক তার পাশে থাকে শীতলতা নিয়ে। পাহাড় যখন বৃষ্টিতে ভিজে অসুস্থ, লেক তখনো সেই একই জায়গায়, অবিচল, অবিনাশী এক সঙ্গী।

পহেলা মে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। সারা পৃথিবীতে আজ শ্রমিকের অধিকারের কথা বলা হচ্ছে, সভা-মিছিল হচ্ছে, বক্তৃতা হচ্ছে। আর আমরা সেই একই দিনে শ্রীমঙ্গলের চা বাগানে ঘুরছি, যে বাগান টিকে আছে শ্রমিকের রক্ত-ঘামের উপর। চা বাগানের মাঝপথে একজন চা শ্রমিকের সঙ্গে কথা হলো। বয়স্ক মানুষটি নিজেই বললেন তাদের কথা। একজন চা শ্রমিক সারাদিন কাজ করে তেইশ কেজি কচি চা পাতা তুললে পান মাত্র ১৭৮ টাকা। যদি ২৩ কেজির কম তোলেন, তাহলে প্রতি কেজিতে আট টাকা করে কাটা হয়। অথচ এই বাংলাদেশেই সাধারণ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। আমরা যে চা পান করে ক্লান্তি দূর করি, সেই চায়ের পেছনে আছে এক এক জন মানুষের ক্লান্তি, যার কোনো দাম নেই। পহেলা মে’র দিন চা বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে এই কথাগুলো মনে আসতেই সব আনন্দ ম্লান হয়ে গেল। এই সৌন্দর্যের নিচে যে শোষণ লুকিয়ে আছে, তা কি আমাদের চোখে পড়ে? চা শ্রমিকের জীবন যেন মরার মতো বেঁচে থাকা। কোনোমতে ডাল-ভাত খেয়ে দিন পার করা। সরকার কি কখনো এদের কথা ভাবে? মন ভারী হয়ে গেল। কিন্তু জীবনের নিষ্ঠুর নিয়মে সবাই চলে যায়, পেছনে ফিরে তাকায় না। সেদিনও তাই হলো। তাজা আনারস খেলাম সেখানে। পাহাড়ি পথে ক্লান্ত শরীরে সেই রসালো আনারসের মিষ্টি যেন বলল, পৃথিবীতে দুঃখও আছে, মিষ্টিও আছে। দুটোই সত্যি।

সেখান থেকে গেলাম, কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। মৌলভীবাজার জেলার এই চিরহরিৎ বনটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল প্রায় ১,২৫০ হেক্টর আয়তন জুড়ে বিস্তৃত। গেটে ঢুকতেই বানরের দলের দেখা মিলল। মা বানর তার সন্তানকে বুকে আঁকড়ে দুধ খাওয়াচ্ছে প্রকৃতির এই আদিম ও অপরিবর্তনীয় মমতার দৃশ্য দেখলে মানুষের মাতৃত্বের কথা মনে আসে। আরেকটু দূরে একটি বানর আরেকটির মাথার উকুন বেছে দিচ্ছে যতœ করে, এই দৃশ্যে কোথায় যেন মানবিক সম্পর্কের প্রতিফলন। একশ পনেরো টাকা টিকিট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। ভেতরে পা দিতেই বড় বড় গাছের ছায়া আমাদের ঢেকে নিল। এই বনে শতবর্ষী গাছ আছে, বিশাল শিরীষ ও গর্জন গাছ আকাশ ছুঁতে চাইছে। ডালে ডালে পাখির ডাক, মাটিতে শুকনো পাতার মর্মর। আরও ভেতরে গিয়ে একটি তথ্যফলক চোখে পড়ল। জানা গেল, এই বনের রেললাইনটি কোনো সাধারণ রেললাইন নয়। এখানেই ১৯৫৫ সালে শুটিং হয়েছিল অস্কারজয়ী হলিউড চলচ্চিত্র অৎড়ঁহফ ঃযব ডড়ৎষফ রহ ৮০ উধুং-এর, পরিচালনায় মাইকেল টড। ১৯৫৬ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি সেই বছর পাঁচটি অ্যাকাডেমি পুরস্কার জিতেছিল, যার মধ্যে ছিল সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কারও। এই বনের ছায়া একদিন হলিউডের পর্দায় ঝলমল করেছে।

এই একই বনে, আরও পরে, ২০০৮ সালে, চিত্রায়িত হয়েছিল হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত চলচ্চিত্র আমার আছে জল। হুমায়ূন আহমেদ এই বনের নিঃশব্দ গভীরতা পছন্দ করেছিলেন। আমরা আরও গভীরে গেলাম খাসিয়া পল্লীতে। এই আদিবাসী জনগোষ্ঠী পাহাড়ের ভেতরে নিজেদের জীবন গড়ে নিয়েছে। ছোট ছোট বাড়ি, কয়েকটি দোকান, সাধারণ নিত্যপণ্যের কেনাবেচা পাহাড়ের গভীরে এই জীবনের এক আলাদা শান্তি আছে। তারপর এলো সেই বিব্রতকর মুহূর্ত।

সবাই চা খেতে আরও ভেতরের পাহাড়ে গেল। আমার শরীর তখন আর পেরে উঠছিল না। একটি রেস্টহাউসে বসলাম। ঝিমঝিমে অনুভূতির মধ্যে কতক্ষণ কেটে গেল বলতে পারব না। হঠাৎ বুঝলাম চারদিকে কেউ নেই। প্রচ- বৃষ্টি শুরু হয়েছে। একা এক রেস্টহাউসে বসে আছি, আর দলের বাকি সবাই গাড়িতে উঠে রওনা হয়ে গেছে।

তখনই দেখলাম ছাতা হাতে আসছে বন্ধু ফরহাদ আর ছোট ভাই সাইদুল। তাদের চেহারায় অপরাধবোধ আর উদ্বেগের মিশ্রণ। পরে জানা গেল, প্রচ- বৃষ্টির আগেই সবাই গাড়িতে উঠে পড়েছিল, আমার কথা মনে ছিল না। একটু পরে মনে পড়তেই ফিরে এসেছে। লাউয়াছড়া তাই আমার কাছে কিছুটা অভিশপ্তই মনে হলো। পাহাড় ছাড়া দেখার মতো বিশেষ কিছু যদি না-ও থাকে, সেই একাকিত্বের স্মৃতিটা তো রয়েই গেল।

সরকারের কাছে একটাই বিনম্র আবেদন, এই উদ্যানের টিকিট মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে আসা হোক।

দুপুর হয়ে গেছে। আজ শুক্রবার। গ্র্যান্ড সুলতান রেস্টুরেন্টের সামনের মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করলাম। মসজিদ থেকে বের হতেই পেটে ক্ষুধার সংকেত। গরুর মাংস দিয়ে ভাত খেলাম। ভ্রমণের পরে এই সাধারণ খাবারটাও যে কী অসাধারণ লাগে! এরপর গেলাম রাবার বাগান। রাবার গাছের সারি সারি বিন্যাস চা বাগানের চেয়ে ভিন্ন সৌন্দর্য রাখে। তারপর গেলাম সেই বিখ্যাত নীলকণ্ঠ চা কেবিনে যেখানে সাত রঙের চা পাওয়া যায়। শ্রীমঙ্গলে এলে এই চা না খাওয়া যেন তীর্থে গিয়ে মাথা না নোয়ানোর মতো। তাই খেলাম। দেখতে অসাধারণ, একটি কাচের গ্লাসে সাতটি রঙের স্তর, যেন ছোট্ট একটি রংধনু বন্দি হয়ে আছে। প্রতিটি স্তর আলাদা তাপমাত্রার চা ও দুধ-চিনির মিশ্রণে তৈরি। কিন্তু স্বাদের প্রশ্নে সৎ থাকতে হবে, চা টা কার্যত মন্দ। দামের তুলনায় যা পেলাম, তা হলো চোখের আনন্দ। পেটের না। তবে দেখার জন্য একবার খাওয়া যায়, একটা অভিজ্ঞতার নাম হিসেবে।

এরপর গেলাম, শ্রীমঙ্গলের রূপসপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, স্থানীয়ভাবে যা পরিচিত ‘সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা’ নামে। এটি মূলত একটি বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, পাশাপাশি একটি মিনি চিড়িয়াখানা। এখানে মায়া হরিণের লাজুক চোখ দেখলাম। ভালুকের অলস ঘুরে বেড়ানো। বিপন্ন প্রজাতির লজ্জাবতী বানর, গন্ধগোকুল, বনবিড়াল, বন্য শূকর, অজগর সাপের কু-লি পাকানো বিশাল দেহ, সোনালি কচ্ছপ, ও ঈগল পাখি তার খাঁচায় গর্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হুতোমপেঁচা, লক্ষ্মীপেঁচা, বনমোরগ, কালেম, মুনিয়া, টিয়া, ময়নাসহ আরও অনেক পাখি ও প্রাণী, এই যেন পাখি ও প্রাণীদের এক ছোট্ট সংসার। সারাদিনের ক্লান্তি ছিল, কিন্তু প্রতিটি প্রাণী দেখার সঙ্গে সঙ্গে মনে এক নতুন শক্তি সঞ্চার হচ্ছিল। কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটা এলো অন্যভাবে। চিড়িয়াখানার ভেতরে একদল ছোট শিশু তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে হাঁটছে। তারা প্রতিটি খাঁচার সামনে থেমে প্রাণীর নাম বলছে উচ্চৈঃস্বরে, ‘বানর! ময়না! হরিণ!’ তাদের চোখে অবাক বিস্ময়, মুখে খুশির আনন্দ। সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হলো, এই তো আমিও একদিন তাদের মতো ছিলাম। এই একই বিস্ময়, এই একই আনন্দ। ক্ষণিকের জন্য, শৈশবের স্মৃতিতে ডুব দিলাম মনের অজান্তেই। সেই ডুবটুকুই হয়তো এই ভ্রমণের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্ত।

শেষ গন্তব্য বধ্যভূমি ৭১। সারা দিনের হাসি-গল্প-আনন্দের পর এখানে এসে সব চুপ হয়ে যায়। এই মাটিতে একদিন রক্ত পড়েছিল। এই মাটি শুষে নিয়েছে স্বাধীনতার মূল্য। মাগরিবের আজান হলো। নামাজ আদায় করলাম। সেই নামাজে কোনো ঐশ্বরিক নিবেদন ছিল কিনা জানি না, কিন্তু শহিদদের জন্য একটা নীরব কৃতজ্ঞতা ছিল নিশ্চয়ই। যে স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা চা বাগানে ঘুরি, পাহাড়ে চড়ি, লেকের ধারে বসে প্রকৃতি উপভোগ করি, সেই স্বাধীনতার মূল্য এই মাটিতে পরিশোধিত হয়েছে।

শ্রীমঙ্গল স্টেশনে ফিরে এলাম সন্ধ্যায়। ভ্রমণ শেষ। ব্যাগ কাঁধে, শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মন আনন্দে ভরপুর। এই একটি দিনে কতকিছু দেখলাম, কতকিছু ভাবলাম। সবুজের সৌন্দর্য দেখলাম, শ্রমিকের শোষণের কষ্ট অনুভব করলাম। হলিউডের ইতিহাস ছুঁলাম, শৈশবের স্মৃতিতে ডুব দিলাম। বৃষ্টিতে ভিজলাম, আনারস খেলাম, বানর দেখলাম, শহিদের স্মৃতিতে মন খারাপ করলাম। ভ্রমণ মানে শুধু জায়গা বদলানো নয়। ভ্রমণ মানে নিজেকে একটু বদলানো, ভেতর থেকে। শ্রীমঙ্গল সেই সুযোগটা দিয়েছে। ট্রেনে উঠে ফেরার অপেক্ষা। এবারও হয়তো দেরি হবে। এবারও হয়তো চোর থাকবে। কিন্তু এই যাত্রার গল্প, এই দিনটার স্মৃতি, সেটা কেউ চুরি করতে পারবে না।

সমাপ্ত

শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

লেখক : কবি ও গল্পকার।