প্রথম গন্তব্য লাল পাহাড়। নামটা শুনলে মরুভূমির পাথুরে ভূদৃশ্যের কথা মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে সম্পূর্ণ উল্টো। লাল পাহাড়ে পৌঁছে চোখ যেন থমকে যায়। চা-বাগান আর পাহাড় এ দুটি কখন যে পরস্পরের আলিঙ্গনে এতটা সুন্দর হয়ে উঠেছে, তা বলা কঠিন। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা সবুজের ঢেউ, তার মাঝে মাঝে লাল মাটির রং মিলিয়ে একটা প্রাকৃতিক চিত্রকর্ম তৈরি হয়েছে, যা কোনো শিল্পীর তুলিতে ধরা যাবে না। এখানে বানর দেখা গেছে যারা লাফিয়ে লাফিয়ে গাছ থেকে অন?্য গাছে যাতায়াত করছে। দূরে কোনো গাছে বসে এক পাখি ডাকছে, তার নাম জানি না, কিন্তু সুর শুনে মনে হলো সে বলছে স্বাগতম। আমাদের মতো অনেক পর্যটক এসেছেন। তারাও ছবি তুলছেন, হাঁটছেন, পাহাড়ের সৌন্দর্যে হারিয়ে যাচ্ছেন। আমরাও যথেষ্ট ছবি তুলে পরের গন্তব্যের দিকে রওনা হলাম। মাধবপুর লেকের কথা আগে থেকেই শুনেছিলাম। তিন দিকে পাহাড় বেষ্টিত এই হ্রদ নাকি দেখতে অপার্থিব সুন্দর। সেই গল্প কতটা সত্যি তা যাচাই করতে আমরা গেলাম। লেকে ঢোকার প্রবেশমূল্য প্রতি গাড়ি পঁচাত্তর টাকা। কিন্তু আমরা পৌঁছালাম প্রায় সকাল আটটায়, লেক খোলে নয়টায়। এক ঘণ্টা অপেক্ষা করা অবশ্যই সম্ভব, কিন্তু আমাদের সারাদিনে আর ঘোরাঘুরি করতে হবে। তাই টিকিট কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে নির্ধারিত মূল্যের সঙ্গে কিছু বকশিশ দিয়ে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি পাওয়া গেল। বাংলাদেশে এই ব্যবস্থাটাকে অনেকে অনিয়ম বলবেন, অনেকে বলবেন বাস্তবতা। ভেতরে ঢুকতেই বুঝলাম, গল্প মিথ্যে নয়।
তিন দিক থেকে পাহাড় এসে যেন লেককে কোলে তুলে নিয়েছে। পাহাড়ের গায়ে চা বাগানের সবুজ সাম্রাজ্য, আর তার প্রতিফলন লেকের শান্ত জলে, এই দৃশ্য দেখে সত্যিই মনে হয়, পৃথিবীতে এমন কিছু জায়গা আছে যেখানে প্রকৃতি নিজেই স্থপতি হয়ে ওঠেছে। লেকের পাড় ধরে হাঁটছি, এর মধ্যে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টিটা ধীরে ধীরে ভারী হলো, তারপর যেন আমাদের কথা মনে করে একটু বিরতি নিল, যাতে আমরা ছবি তুলতে পারি। যাতে স্মৃতিতে জমা রাখতে পারি কিছু ছবি। বৃষ্টির সেই আদুরে বিরতিতে পাহাড়ে উঠলাম। উপর থেকে যা দেখলাম, তার বর্ণনা দেওয়া সত্যিই কঠিন। কাছের পাহাড় আর দূরের পাহাড়, চা বাগানের সবুজ ঢেউ, আর তাদের মাঝখানে স্থির লেকের জল সব মিলিয়ে একটা দৃশ্য যা শুধু চোখ নয়, বুকের গভীরে গিয়ে স্পর্শ করে। এই লেক আর পাহাড়ের বন্ধুত্বটা যেন চিরকালের। পাহাড় যখন গ্রীষ্মের তাপে জ্বলে, লেক তার পাশে থাকে শীতলতা নিয়ে। পাহাড় যখন বৃষ্টিতে ভিজে অসুস্থ, লেক তখনো সেই একই জায়গায়, অবিচল, অবিনাশী এক সঙ্গী।
পহেলা মে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। সারা পৃথিবীতে আজ শ্রমিকের অধিকারের কথা বলা হচ্ছে, সভা-মিছিল হচ্ছে, বক্তৃতা হচ্ছে। আর আমরা সেই একই দিনে শ্রীমঙ্গলের চা বাগানে ঘুরছি, যে বাগান টিকে আছে শ্রমিকের রক্ত-ঘামের উপর। চা বাগানের মাঝপথে একজন চা শ্রমিকের সঙ্গে কথা হলো। বয়স্ক মানুষটি নিজেই বললেন তাদের কথা। একজন চা শ্রমিক সারাদিন কাজ করে তেইশ কেজি কচি চা পাতা তুললে পান মাত্র ১৭৮ টাকা। যদি ২৩ কেজির কম তোলেন, তাহলে প্রতি কেজিতে আট টাকা করে কাটা হয়। অথচ এই বাংলাদেশেই সাধারণ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। আমরা যে চা পান করে ক্লান্তি দূর করি, সেই চায়ের পেছনে আছে এক এক জন মানুষের ক্লান্তি, যার কোনো দাম নেই। পহেলা মে’র দিন চা বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে এই কথাগুলো মনে আসতেই সব আনন্দ ম্লান হয়ে গেল। এই সৌন্দর্যের নিচে যে শোষণ লুকিয়ে আছে, তা কি আমাদের চোখে পড়ে? চা শ্রমিকের জীবন যেন মরার মতো বেঁচে থাকা। কোনোমতে ডাল-ভাত খেয়ে দিন পার করা। সরকার কি কখনো এদের কথা ভাবে? মন ভারী হয়ে গেল। কিন্তু জীবনের নিষ্ঠুর নিয়মে সবাই চলে যায়, পেছনে ফিরে তাকায় না। সেদিনও তাই হলো। তাজা আনারস খেলাম সেখানে। পাহাড়ি পথে ক্লান্ত শরীরে সেই রসালো আনারসের মিষ্টি যেন বলল, পৃথিবীতে দুঃখও আছে, মিষ্টিও আছে। দুটোই সত্যি।
সেখান থেকে গেলাম, কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। মৌলভীবাজার জেলার এই চিরহরিৎ বনটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল প্রায় ১,২৫০ হেক্টর আয়তন জুড়ে বিস্তৃত। গেটে ঢুকতেই বানরের দলের দেখা মিলল। মা বানর তার সন্তানকে বুকে আঁকড়ে দুধ খাওয়াচ্ছে প্রকৃতির এই আদিম ও অপরিবর্তনীয় মমতার দৃশ্য দেখলে মানুষের মাতৃত্বের কথা মনে আসে। আরেকটু দূরে একটি বানর আরেকটির মাথার উকুন বেছে দিচ্ছে যতœ করে, এই দৃশ্যে কোথায় যেন মানবিক সম্পর্কের প্রতিফলন। একশ পনেরো টাকা টিকিট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। ভেতরে পা দিতেই বড় বড় গাছের ছায়া আমাদের ঢেকে নিল। এই বনে শতবর্ষী গাছ আছে, বিশাল শিরীষ ও গর্জন গাছ আকাশ ছুঁতে চাইছে। ডালে ডালে পাখির ডাক, মাটিতে শুকনো পাতার মর্মর। আরও ভেতরে গিয়ে একটি তথ্যফলক চোখে পড়ল। জানা গেল, এই বনের রেললাইনটি কোনো সাধারণ রেললাইন নয়। এখানেই ১৯৫৫ সালে শুটিং হয়েছিল অস্কারজয়ী হলিউড চলচ্চিত্র অৎড়ঁহফ ঃযব ডড়ৎষফ রহ ৮০ উধুং-এর, পরিচালনায় মাইকেল টড। ১৯৫৬ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি সেই বছর পাঁচটি অ্যাকাডেমি পুরস্কার জিতেছিল, যার মধ্যে ছিল সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কারও। এই বনের ছায়া একদিন হলিউডের পর্দায় ঝলমল করেছে।
এই একই বনে, আরও পরে, ২০০৮ সালে, চিত্রায়িত হয়েছিল হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত চলচ্চিত্র আমার আছে জল। হুমায়ূন আহমেদ এই বনের নিঃশব্দ গভীরতা পছন্দ করেছিলেন। আমরা আরও গভীরে গেলাম খাসিয়া পল্লীতে। এই আদিবাসী জনগোষ্ঠী পাহাড়ের ভেতরে নিজেদের জীবন গড়ে নিয়েছে। ছোট ছোট বাড়ি, কয়েকটি দোকান, সাধারণ নিত্যপণ্যের কেনাবেচা পাহাড়ের গভীরে এই জীবনের এক আলাদা শান্তি আছে। তারপর এলো সেই বিব্রতকর মুহূর্ত।
সবাই চা খেতে আরও ভেতরের পাহাড়ে গেল। আমার শরীর তখন আর পেরে উঠছিল না। একটি রেস্টহাউসে বসলাম। ঝিমঝিমে অনুভূতির মধ্যে কতক্ষণ কেটে গেল বলতে পারব না। হঠাৎ বুঝলাম চারদিকে কেউ নেই। প্রচ- বৃষ্টি শুরু হয়েছে। একা এক রেস্টহাউসে বসে আছি, আর দলের বাকি সবাই গাড়িতে উঠে রওনা হয়ে গেছে।
তখনই দেখলাম ছাতা হাতে আসছে বন্ধু ফরহাদ আর ছোট ভাই সাইদুল। তাদের চেহারায় অপরাধবোধ আর উদ্বেগের মিশ্রণ। পরে জানা গেল, প্রচ- বৃষ্টির আগেই সবাই গাড়িতে উঠে পড়েছিল, আমার কথা মনে ছিল না। একটু পরে মনে পড়তেই ফিরে এসেছে। লাউয়াছড়া তাই আমার কাছে কিছুটা অভিশপ্তই মনে হলো। পাহাড় ছাড়া দেখার মতো বিশেষ কিছু যদি না-ও থাকে, সেই একাকিত্বের স্মৃতিটা তো রয়েই গেল। সরকারের কাছে একটাই বিনম্র আবেদন, এই উদ্যানের টিকিট মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে আসা হোক।
দুপুর হয়ে গেছে। আজ শুক্রবার। গ্র্যান্ড সুলতান রেস্টুরেন্টের সামনের মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করলাম। মসজিদ থেকে বের হতেই পেটে ক্ষুধার সংকেত। গরুর মাংস দিয়ে ভাত খেলাম। ভ্রমণের পরে এই সাধারণ খাবারটাও যে কী অসাধারণ লাগে! এরপর গেলাম রাবার বাগান। রাবার গাছের সারি সারি বিন্যাস চা বাগানের চেয়ে ভিন্ন সৌন্দর্য রাখে। তারপর গেলাম সেই বিখ্যাত নীলকণ্ঠ চা কেবিনে যেখানে সাত রঙের চা পাওয়া যায়। শ্রীমঙ্গলে এলে এই চা না খাওয়া যেন তীর্থে গিয়ে মাথা না নোয়ানোর মতো। তাই খেলাম। দেখতে অসাধারণ, একটি কাচের গ্লাসে সাতটি রঙের স্তর, যেন ছোট্ট একটি রংধনু বন্দি হয়ে আছে। প্রতিটি স্তর আলাদা তাপমাত্রার চা ও দুধ-চিনির মিশ্রণে তৈরি। কিন্তু স্বাদের প্রশ্নে সৎ থাকতে হবে, চা টা কার্যত মন্দ। দামের তুলনায় যা পেলাম, তা হলো চোখের আনন্দ। পেটের না। তবে দেখার জন্য একবার খাওয়া যায়, একটা অভিজ্ঞতার নাম হিসেবে।
এরপর গেলাম, শ্রীমঙ্গলের রূপসপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, স্থানীয়ভাবে যা পরিচিত ‘সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা’ নামে। এটি মূলত একটি বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, পাশাপাশি একটি মিনি চিড়িয়াখানা। এখানে মায়া হরিণের লাজুক চোখ দেখলাম। ভালুকের অলস ঘুরে বেড়ানো। বিপন্ন প্রজাতির লজ্জাবতী বানর, গন্ধগোকুল, বনবিড়াল, বন্য শূকর, অজগর সাপের কু-লি পাকানো বিশাল দেহ, সোনালি কচ্ছপ, ও ঈগল পাখি তার খাঁচায় গর্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হুতোমপেঁচা, লক্ষ্মীপেঁচা, বনমোরগ, কালেম, মুনিয়া, টিয়া, ময়নাসহ আরও অনেক পাখি ও প্রাণী, এই যেন পাখি ও প্রাণীদের এক ছোট্ট সংসার। সারাদিনের ক্লান্তি ছিল, কিন্তু প্রতিটি প্রাণী দেখার সঙ্গে সঙ্গে মনে এক নতুন শক্তি সঞ্চার হচ্ছিল। কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটা এলো অন্যভাবে। চিড়িয়াখানার ভেতরে একদল ছোট শিশু তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে হাঁটছে। তারা প্রতিটি খাঁচার সামনে থেমে প্রাণীর নাম বলছে উচ্চৈঃস্বরে, ‘বানর! ময়না! হরিণ!’ তাদের চোখে অবাক বিস্ময়, মুখে খুশির আনন্দ। সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হলো, এই তো আমিও একদিন তাদের মতো ছিলাম। এই একই বিস্ময়, এই একই আনন্দ। ক্ষণিকের জন্য, শৈশবের স্মৃতিতে ডুব দিলাম মনের অজান্তেই। সেই ডুবটুকুই হয়তো এই ভ্রমণের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্ত।
শেষ গন্তব্য বধ্যভূমি ৭১। সারা দিনের হাসি-গল্প-আনন্দের পর এখানে এসে সব চুপ হয়ে যায়। এই মাটিতে একদিন রক্ত পড়েছিল। এই মাটি শুষে নিয়েছে স্বাধীনতার মূল্য। মাগরিবের আজান হলো। নামাজ আদায় করলাম। সেই নামাজে কোনো ঐশ্বরিক নিবেদন ছিল কিনা জানি না, কিন্তু শহিদদের জন্য একটা নীরব কৃতজ্ঞতা ছিল নিশ্চয়ই। যে স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা চা বাগানে ঘুরি, পাহাড়ে চড়ি, লেকের ধারে বসে প্রকৃতি উপভোগ করি, সেই স্বাধীনতার মূল্য এই মাটিতে পরিশোধিত হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল স্টেশনে ফিরে এলাম সন্ধ্যায়। ভ্রমণ শেষ। ব্যাগ কাঁধে, শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মন আনন্দে ভরপুর। এই একটি দিনে কতকিছু দেখলাম, কতকিছু ভাবলাম। সবুজের সৌন্দর্য দেখলাম, শ্রমিকের শোষণের কষ্ট অনুভব করলাম। হলিউডের ইতিহাস ছুঁলাম, শৈশবের স্মৃতিতে ডুব দিলাম। বৃষ্টিতে ভিজলাম, আনারস খেলাম, বানর দেখলাম, শহিদের স্মৃতিতে মন খারাপ করলাম। ভ্রমণ মানে শুধু জায়গা বদলানো নয়। ভ্রমণ মানে নিজেকে একটু বদলানো, ভেতর থেকে। শ্রীমঙ্গল সেই সুযোগটা দিয়েছে। ট্রেনে উঠে ফেরার অপেক্ষা। এবারও হয়তো দেরি হবে। এবারও হয়তো চোর থাকবে। কিন্তু এই যাত্রার গল্প, এই দিনটার স্মৃতি, সেটা কেউ চুরি করতে পারবে না।
লেখক : শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

