ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

দেশ-বিদেশে ঈদের ভ্রমণ

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: মে ২৩, ২০২৬, ০১:০৬ এএম

উৎসবের আনন্দের সঙ্গে ভ্রমণের নিবিড় মনস্তাত্ত্বিক সংযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ঈদের দীর্ঘ অবকাশ যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তির মোক্ষম সুযোগ এনে দেয়। চেনা শহরের চেনা বৃত্তের বাইরে গিয়ে একটু নিশ্বাস নেওয়া, নতুন সংস্কৃতির মুখোমুখি হওয়া কিংবা প্রকৃতির সান্নিধ্যে কয়েকটা দিন কাটানো; এ সবের প্রস্তুতি শুরু হয় ঈদের কিছুদিন আগে থেকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভ্রমণ ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। এখন কেবল ঘরের কাছে ঘুরে আসাই নয়, বরং বাজেট এবং সময়ের সমন্বয় ঘটিয়ে দেশের সীমানা পেরিয়ে দূর-দূরান্তের আন্তর্জাতিক গন্তব্যে যাওয়ার প্রবণতাও বেশ লক্ষণীয়। পর্যটকদের এই চাহিদাকে মাথায় রেখে এয়ারলাইন্স ও ট্যুর অপারেটরগুলোও সাজায় নানামুখী আয়োজন। ঈদ-পরবর্তী ভ্রমণের তেমনই কিছু জনপ্রিয় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গন্তব্যের খবর জানাচ্ছেন মির্জা হাসান মাহমুদ

দেশীয় গন্তব্য

আমাদের দেশের ভূপ্রকৃতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো বৈচিত্র্য। একদিকে যেমন রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, অন্যদিকে রয়েছে প্রাচীন সব নদী ও হাওরের বিস্তার। দেখে নিন ঈদে ঘুরে বেড়ানোর মতো কিছু জায়গার খোঁজ-

কক্সবাজার

উৎসবের ছুটিতে বাঙালির ঘোরার তালিকায় সবার ওপরে যে নাম আসে, তা হলোÑ কক্সবাজার। সারি সারি ঝাউবন, বিস্তীর্ণ বালুকাবেলা ও বঙ্গোপসাগরের গর্জন পর্যটকদের বারবার টানে। ঈদ পরবর্তী দিনগুলোতে সৈকত শহরটি উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। তবে কেবল মূল সৈকতেই সীমাবদ্ধ না থেকে পর্যটকরা এখন মেরিন ড্রাইভ ধরে হিমছড়ি বা ইনানীর দিকে ছুটে যান। সময় ও সুযোগ থাকলে সোনাদিয়া, মহেশখালী কিংবা নীল জলের সেন্ট মার্টিন দ্বীপও এই অঞ্চলের প্রধান আকর্ষণ। সাগরের সমান্তরালে তৈরি হওয়া মেরিন ড্রাইভ দিয়ে পথ চলার অভিজ্ঞতা যেকোনো ভ্রমণকারীর ঝুলিতেই জমা করে ভিন্ন অনুভূতি।

কুয়াকাটা

যারা একটু ভিন্ন ধাঁচের সমুদ্রের রূপ দেখতে চান, তাদের পছন্দ কুয়াকাটা। বাংলাদেশের এই একটিমাত্র সৈকত যেখানে দাঁড়িয়ে একই সঙ্গে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সাক্ষী হওয়া যায়। ঈদের ছুটিতে কুয়াকাটার শান্ত সৈকতে পর্যটকদের সমাগম বাড়ে। গঙ্গামতির বাঁক, লেবুরচর কিংবা ফাতরার বনের মতো প্রাকৃতিক স্পটগুলো কুয়াকাটার ভ্রমণকে আরও অর্থবহ করে তোলে। সমুদ্রের বুকে জেলেদের নৌকা আর ঢেউয়ের লুকোচুরি দেখার জন্য এই সৈকতটি অনন্য।

পাহাড়ে পাথুরে নদীর টান

ভ্রমণের বেলায় সমুদ্রের বিশালতা যাদের টানে না, তাদের জন্য রয়েছে পাহাড়ের গম্ভীর রূপ ও পাহাড়ি নদীর স্বচ্ছ পানির প্রবাহ।

সাজেক উপত্যকা

রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত সাজেক ভ্যালি বর্তমানে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পাহাড়ি গন্তব্য। খাগড়াছড়ি থেকে চাঁন্দের গাড়িতে চড়ে আঁকাবাঁকা ও খাড়া পাহাড়ি পথ পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতা একাধারে রোমাঞ্চকর এবং নান্দনিক। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থিত এই উপত্যকায় দাঁড়ালে মনে হয় যেন মেঘের ওপরে এক নতুন শহর। সকালে কুয়াশার চাদর, দুপুরে কড়া রোদ আর বিকেলে হঠাৎ করে ধেয়ে আসা মেঘের দল সাজেককে ক্ষণে ক্ষণে নতুন রূপ দেয়। এখানকার কটেজগুলোর বারান্দায় বসে সূর্যাস্ত দেখার স্মৃতি সহজে ভোলার নয়।

জাফলং

সিলেটের সীমান্তঘেঁষা জনপদ জাফলং ডাউকি পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। পিয়াইন নদীর তলদেশে স্তরে স্তরে জমে থাকা পাথর আর ওপারে ভারতের মেঘালয়ের সুউচ্চ সবুজ পাহাড়ের দৃশ্য এখানকার প্রধান সৌন্দর্য। নদীর স্বচ্ছ পানিতে নৌকায় চড়ে বেড়ানো এবং কাছাকাছি থাকা মায়াবী ঝর্ণার শীতল জলধারা ভ্রমণকারীদের ক্লান্তি নিমেষেই দূর করে দেয়। চা বাগানের সবুজ খাসিয়া পুঞ্জি আর খাসিয়া সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রাও এই ভ্রমণের অন্যতম অনুষঙ্গ।

বিরিশিরি

একটু ভিন্ন ধারার এবং শান্ত পরিবেশের খোঁজে যারা বের হন, তাদের জন্য নেত্রকোনার দুর্গাপুরের বিরিশিরি একটি আদর্শ জায়গা। সোমেশ্বরী নদীর স্বচ্ছ জল আর বিজয়পুরের সাদা মাটির পাহাড়ের খনি এখানকার প্রধান আকর্ষণ। পাহাড়ের খাঁজে জমে থাকা বৃষ্টির পানি এখানে তৈরি করেছে চমৎকার নীল পানির হ্রদ।

গারো ও হাজং সংস্কৃতির এই জনপদটি যারা কিছুটা নিরিবিলিতে প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে চান, তাদের জন্য দারুণ এক গন্তব্য।

সীমানা পেরিয়ে দেশের বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে দূরত্বের দিক থেকে প্রথম পছন্দ হিসেবে আসে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো। অল্প সময়ে এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী বাজেটে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের স্বাদ দিতে এদের জুড়ি নেই।

ভারত

বৈচিত্র্যের দিক থেকে ভারতের পর্যটন শিল্প অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ঈদের ছুটিতে অনেকেই কলকাতার ঐতিহাসিক স্থাপত্য, যেমন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বা হাওড়া ব্রিজের চেনা পথ ধরে হাঁটতে পছন্দ করেন। তবে যারা পাহাড় ভালোবাসেন, তারা ছুটে যান হিমাচল প্রদেশের শিমলা কিংবা মানালির বরফঢাকা উপত্যকায়। আবার জম্মু-কাশ্মীরের গুলমার্গ কিংবা লাদাখের হ্রদ ও পর্বতের গম্ভীর রূপও অনেকের ঈদ ভ্রমণের তালিকায় স্থান পায়। দক্ষিণ এশিয়ার এই বিশাল দেশে একেকটি অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ভূপ্রকৃতি একেক রকম, যা প্রতিনিয়ত নতুন অভিজ্ঞতা জোগায়।

নেপাল-ভুটান

অ্যাডভেঞ্চার ও ট্র্যাকিংয়ের জন্য নেপাল স্বর্গরাজ্য। পোখারার ফেওয়া হ্রদে নৌভ্রমণ কিংবা নাগরকোট থেকে অন্নপূর্ণা পর্বতশ্রেণির ওপর সূর্যোদয় দেখার দৃশ্য যেকোনো মানুষের জীবনবোধকে সমৃদ্ধ করতে বাধ্য। কাঠমান্ডুর প্রাচীন মন্দির ও দরবার স্কয়ারের স্থাপত্যশৈলীও ইতিহাসপ্রেমীদের মুগ্ধ করে। অন্যদিকে বজ্র ড্রাগনের দেশ ভুটান হলো শান্তি আর প্রকৃতির এক নিভৃতালয়। থিম্পুর পরিচ্ছন্ন রাস্তা, পারো শহরের পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা ঐতিহাসিক ‘টাইগার্স নেস্ট মনাস্ট্রি’ কিংবা পুনাখার প্রাচীন জংগুলো দেখলে মনে হয় যেন কোনো রূপকথার দেশে প্রবেশ করেছেন। হিমালয়ের নির্মল বাতাস আর ভুটানিজদের সাধারণ জীবনযাপন মনকে শান্ত করে।

দূর প্রাচ্যের ঝলমলে নগরী

আধুনিক নগর সভ্যতা, উন্নত জীবনমান আর সাগরের নীল জল যাদের পছন্দ, তাদের ভ্রমণের তালিকায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোই প্রাধান্য পায়।

সিঙ্গাপুর

আধুনিকতার রূপ দেখতে চাইলে সিঙ্গাপুরের বিকল্প কমই আছে। মেরিনা বে স্যান্ডসের চমৎকার স্থাপত্য, সেন্তোসা দ্বীপের বিনোদন পার্ক, সিঙ্গাপুর ফ্লায়ার আর চ্যাঙ্গি বিমানবন্দরের ভেতরের কৃত্রিম জলপ্রপাত জুয়েল; প্রতিটি স্থানই মানুষের প্রকৌশল বিদ্যার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে। উৎসবের ছুটিতে যারা কৃত্রিম উপায়ে সাজানো নিখুঁত এক নগরীতে হারিয়ে যেতে চান, তাদের জন্য সিঙ্গাপুর একটি চমৎকার পছন্দ।

থাইল্যান্ড

পর্যটকদের কাছে থাইল্যান্ডের আকর্ষণ চিরন্তন। ব্যাংককের গ্র্যান্ড প্যালেস ও প্রাচীন বুদ্ধ মন্দির যেমন সংস্কৃতির পরিচয় দেয়, তেমনই পাতায়ো বা ফুকেটের সমুদ্রসৈকতগুলো দেয় রোমাঞ্চের স্বাদ। পাতায়ার নীল সাগরে প্যারাগ্লাইডিং কিংবা ফুকেটের ক্রিস্টাল ক্লিয়ার ওয়াটারে স্কুবা ডাইভিংয়ের মতো কার্যক্রম ভ্রমণের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। চিয়াংমাইয়ের শান্ত পাহাড়ি পরিবেশও অনেককে আকর্ষণ করে।

মালয়েশিয়া

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরেকটি জনপ্রিয় দেশ মালয়েশিয়া। কুয়ালালামপুরের যমজ অট্টালিকা ‘পেট্রোনাস টাওয়ার’ যেমন আধুনিকতার প্রতীক, তেমনই লঙ্কাউই দ্বীপের শান্ত সৈকত আর ক্যামেরুন হাইল্যান্ডের বিশাল চায়ের বাগান প্রকৃতির এক অনবদ্য সৃষ্টি। এখানে একই সঙ্গে আধুনিক নগর এবং আদিম প্রকৃতির এক চমৎকার ভারসাম্য দেখতে পাওয়া যায়।

ইন্দোনেশিয়া

সমুদ্রপ্রেমী ও ঐতিহ্য সন্ধানীদের জন্য ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপ এক স্বপ্নের নাম। বালির প্রাচীন হিন্দু মন্দির, ধাপে ধাপে সাজানো ধানের খেত আর সার্ফিংয়ের জন্য বিখ্যাত সমুদ্রসৈকতগুলো বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। ঈদের ছুটিতে বালির কোনো নির্জন রিসোর্টে বসে সাগরের ঢেউয়ের শব্দ শোনার মাঝে যে প্রশান্তি রয়েছে, তা যান্ত্রিক জীবনের সব ক্লান্তি এক নিমেষেই ভুলিয়ে দেয়।

ভ্রমণ পরিকল্পনা

আগেভাগে বুকিং

ঈদের পর সব জায়গাতেই পর্যটকদের চাপ বেশি থাকে। তাই হোটেল, রিসোর্ট কিংবা বিমান ও ট্রেনের টিকিট আগে থেকেই বুকিং করে রাখা নিরাপদ। শেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করলে খরচ যেমন বাড়ে, তেমনই পরিকল্পনায় বিঘœ ঘটতে পারে।

বাজেট ও দরদাম

স্থানীয় যাতায়াত, যেমন চাঁন্দের গাড়ি, সিএনজি বা বোট ভাড়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো হার সব সময় বজায় থাকে না। তাই স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে দরদাম করে নেওয়া ভালো। আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রেও প্যাকেজ বুকিংয়ের আগে সব শর্ত ভালো করে দেখে নেওয়া উচিত।

নথিপত্র

দেশের বাইরে ভ্রমণের জন্য পাসপোর্ট, ভিসা এবং প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থান আগে থেকেই নিশ্চিত করুন। দেশের ভেতরে দুর্গম এলাকায় ভ্রমণের ক্ষেত্রেও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সঙ্গে রাখা জরুরি।

পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা

আমরা যেখানেই যাই না কেন, সেখানকার পরিবেশ ও স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আমাদের দায়িত্ব। অপচনশীল বর্জ্য যত্রতত্র ফেলে প্রকৃতির ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকা উচিত।