ঢাকা শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

জলের ক্যানভাসে স্বপ্নের সফর

হাসিন রায়হান
প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬, ০৭:০৬ এএম

বর্ষার মেঘলা দিন হঠাৎ রূপ বদলায়, আর মেঘের নীল-ধূসর প্রচ্ছদ বিছিয়ে দেয় আকাশের গায়। কিন্তু দেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে এই বর্ষার প্রকাশ অনন্য, কিছুটা অদ্ভুত ও ভীষণ মহিমান্বিত। দিগন্ত বিস্তৃত মিষ্টি জলের হাওর-বাঁওড় বাংলাদেশের প্রকৃতির অপূর্ব বিস্ময়। বর্ষা এলে শুকিয়ে থাকা জনপদ রূপ নেয় সৌন্দর্যের সমুদ্রে; যতদূর চোখ যায় কেবল জল আর জলের খেলা। আকাশ ও জলের এই যুগলবন্দির মাঝে হঠাৎ হঠাৎ চোখে পড়ে ছোট ছোট একেকটি বাড়ি। দূর থেকে মনে হয়, উথাল-পাথাল তরঙ্গের মাঝে কচুরিপানার মতো ভেসে আছে কুঁড়েঘরগুলো, যেন জলের ওপর রাখা একেকটি নিঃসঙ্গ দ্বীপ। চারপাশের উন্মুক্ত জলরাশির মাঝেই মহিষের মতো ঘাড় উঁচিয়ে আকাশ পানে চেয়ে থাকে হিজল ও করচ গাছের সারি। এই রূপ-মাধুরীর প্রাণকেন্দ্র হলো সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর। প্রথমবার যে পর্যটক এই বর্ষাস্নাত বিশালতার মুখোমুখি হন, ক্ষণিকের জন্য হলেও তার মনে সমুদ্র দর্শনের ভ্রম জাগতে বাধ্য। বিশেষ করে আষাঢ়-শ্রাবণের বর্ষাকালে টাঙ্গুয়া লাভ করে তার পূর্ণ যৌবন, যা ভ্রমণপিয়াসীদের আকর্ষণ করে অলৌকিক মায়াজালে।

বর্ষার টাঙ্গুয়া

ভাটির জনপদ সুনামগঞ্জে প্রকৃতি যেন তার ঝুলি উপচে ঢেলে দিয়েছে রূপ ও বৈচিত্র্য। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা এই জলাভূমি কেবল জলরাশির জন্য নয়, বরং তার সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতির সৌন্দর্যের জন্য বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত একটি রামসার সাইট।

জুনের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে বর্ষার মূল মৌসুম, যা হাওর ভ্রমণের সবচেয়ে আদর্শ সময়। এ সময় হাওরের মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠে মেঘালয়ের পাহাড় আর নীলাদ্রির রূপকথা।

উত্তরে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজে মোড়া মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনা আর শুভ্র মেঘের ওড়াওড়ি সারাদিনই চলে হাওরের আকাশে। বিকেলের রোদ যখন ম্লান হয়ে আসে, তখন পাহাড়ের নীলাভ ছায়া এসে পড়ে টলটলে জলের বুকে। তখন পুরো টাঙ্গুয়াকে মনে হয় এক কল্পলোকের ক্যানভাস। বর্ষায় দিগন্তবিস্তৃত জলের ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে হিজল ও করচ গাছের সারি। জলের নিচে খেলা করে নানা পদের জলজ উদ্ভিদ। শুধু তাই নয়, হাওরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া যাদুকাটা ও পাতলাই নদীর কাঁচের মতো টলটলে পানি আর তীরের সৌন্দর্য ভ্রমণকে করে তোলে আরও রঙিন। হাওর পেরিয়ে যাদুকাটার তীর ধরে এগিয়ে গেলেই দেখা মেলে ভারতের সীমান্তবর্তী অপরূপ বারেকের টিলা, যা এই বর্ষার দিনে ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করে।

বর্ষায় টাঙ্গুয়ার মূল আকর্ষণ:

  •  দিগন্তবিস্তৃত থৈ থৈ জলরাশি ও ভাসমান দ্বীপের মতো গ্রাম
  •  জলে ডুবে থাকা হিজল-করচ ও অনন্য সুন্দর জলজ বন
  •  উত্তর পাশে মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে মেঘ-রোদের খেলা
  •  যাদুকাটা ও পাতলাই নদীর স্ফটিক স্বচ্ছ টলটলে পানি
  •  নিলাদ্রী লেক ও বারেকের টিলার মনোহর প্রাকৃতিক দৃশ্য

রুপালি রাতে জলের সুর

টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রকৃত মায়াবী রূপ দেখতে হলে অন্তত একটি রাত কাটাতে হয় হাওরের বুকে। দিনের বেলার প্রখর বা মেঘলা রূপের চেয়ে রাতের টাঙ্গুয়া সম্পূর্ণ আলাদা। বিশেষ করে পূর্ণিমা বা জোৎস্নার রাতে হাওর তার সৌন্দর্যের চূড়ান্ত সুধা ঢেলে দেয়। মেঘমুক্ত আকাশে যখন চাঁদ ওঠে, তখন রুপালি আলো ঠিকরে পড়ে বিশাল জলরাশির ওপর। চারপাশের নিস্তব্ধতার মাঝে কেবল শোনা যায় নৌকার গায়ে জলের মৃদু আঘাতের শব্দ। হাওরের এই রুপালি রাতে বসায় লোকসংগীতের আসর। স্থানীয় মাঝি বা সহযাত্রীদের কণ্ঠে যখন ধামাইল, হাসান রাজা কিংবা বাউল শাহ আবদুল করিমের গান ভেসে আসে, তখন পরম তৃপ্তিতে ভরে ওঠে মন। হাওরের বাতাসে ভেসে থাকা সেই গানের সুর ও চাঁদের আলোর মেলবন্ধন মানুষকে এতটাই মোহাবিষ্ট করে যে তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। জল ও জোৎস্নার এই মায়াবী খেলা না দেখলে তা বিশ্বাস করা যায় না।

জলের রাজপ্রাসাদ

একসময় হাওর ভ্রমণের একমাত্র মাধ্যম ছিল ছোট সাধারণ ট্রলার বা কাঠের নৌকা, যেখানে সুযোগ-সুবিধা ছিল সীমিত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টাঙ্গুয়ায় এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। এখন পর্যটকদের সুবিধার্থে যুক্ত হয়েছে শতাধিক দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ‘হাউস বোট’। এসব বোট যেন জলের বুকে ভাসমান একেকটি মিনি রাজপ্রাসাদ বা আধুনিক হোটেল। হাউস বোটগুলোতে এখন যুক্ত রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ও নন-এসি কেবিন।  মানসম্মত বিছানা ও আরামদায়ক থাকার ব্যবস্থা।  আধুনিক অ্যাটাচড ওয়াশরুম।খোলা আপ-ডেক বা বারান্দা, বসে হাওরের বাতাস, জোৎস্নালোক ও প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করার জায়গা। ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু খাবার, স্থানীয় টাটকা রুই, বাঘাড়, চিতল বা হাওরের হাঁসের মাংস দিয়ে সাজানো খাস ভোজন।

সাধারণত ২ দিন ১ রাতের প্যাকেজে এসব হাউস বোটে দলগতভাবে ভ্রমণ করা যায়।  তবে যাদের সময় কম, তারা তাহিরপুর ঘাট থেকে স্পিড বোট ভাড়া করে একদিনেই ঘুরে আসতে পারেন প্রধান প্রধান পয়েন্টগুলো।

যাত্রাপথ

রাজধানী ঢাকা কিংবা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে টাঙ্গুয়ার হাওরে পৌঁছানো এখন অনেকটাই সহজ ও সুবিধাজনক। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে খুব অনায়াসেই পৌঁছানো যায় দেশের এই অন্যতম রূপসী জলাভূমিতে।

ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ

ঢাকার সায়েদাবাদ, মহাখালী বা ফকিরাপুল বাসস্ট্যান্ড থেকে শ্যামলী, মামুন কিংবা এনটিআরসিএ-এর সরাসরি বাস চলে সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে। সময় লাগে প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা। রাতে বাসে উঠলে ভোরবেলাতেই পৌঁছে যাওয়া যায় সুনামগঞ্জ শহরে।

সিলেট হয়ে সুনামগঞ্জ

যারা সিলেটে অবস্থান করছেন, তারা সিলেটের কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ড থেকে লোকাল বা সিটিং বাসে সুনামগঞ্জ যেতে পারেন। সিটিং বাসে সময় লাগে প্রায় ২ ঘণ্টার মতো। এ ছাড়া শাহজালাল মাজারের সামনে থেকে লাইট মাইক্রোবাসে সহজেই সুনামগঞ্জ যাওয়া যায়।

সুনামগঞ্জ থেকে মূল হাওর

সুনামগঞ্জ নেমে সুরমা নদীর ওপর নির্মিত বড় ব্রিজের কাছে চলে যান। সেখান থেকে লেগুনা, সিএনজি কিংবা মোটরবাইকে চেপে খুব সহজেই যাওয়া যায় তাহিরপুর উপজেলায়। সময় লাগবে ১ থেকে দেড় ঘণ্টা। তাহিরপুর নৌকাঘাটেই অপেক্ষা করে সারি সারি ছোট-বড় নৌকা ও হাউস বোট। তবে হাউস বোট যদি আগেই বুকিং করা থাকে, তবে অনেক সময় বোট সুনামগঞ্জ শহরের সাহেব বাড়ি ঘাট থেকেও ছেড়ে থাকে। সেক্ষেত্রে আর কষ্ট করে তাহিরপুর যাওয়ার প্রয়োজন হয় না।

দায়িত্বশীল পর্যটন

টাঙ্গুয়ার হাওর কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়; এটি একটি সংবেদনশীল ইকো-সিস্টেম এবং শত শত প্রজাতির মাছ, জলজ উদ্ভিদ ও দেশি-বিদেশি পাখির অভয়ারণ্য। ফলে এই অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব প্রতিটি পর্যটকের। বর্ষার দিনে হাওর ভ্রমণের সময় বিনোদনের পাশাপাশি সচেতন থাকাও অত্যন্ত জরুরি।

ভ্রমণকালীন পালনীয় বিষয়গুলো:

নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ : হাওরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই লাইফ জ্যাকেট পরা বাধ্যতামূলক। জলরাশি দেখতে শান্ত মনে হলেও বর্ষায় হাওরের ঢেউ ও গভীরতা বিপজ্জনক হতে পারে।

বজ্রপাত সতর্কতা : বর্ষাকালে হাওরের উন্মুক্ত বুকে বজ্রপাতের ঝুঁকি থাকে। আকাশে মেঘ ঘনীভূত হলে বা বজ্রপাত শুরু হলে নৌকার ছৈয়ের নিচে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করুন।

পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা : প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট, পলিথিন কিংবা খাবারের উচ্ছিষ্ট কোনোভাবেই হাওরের পানিতে ফেলা যাবে না। প্রতিটি বোটের ডাস্টবিন ব্যবহার করুন।

শব্দদূষণ রোধ : রাতের বেলা হাওরে অতিরিক্ত উচ্চ শব্দে সাউন্ডবক্স বা মাইক বাজানো থেকে বিরত থাকুন। তীব্র আলো ও উচ্চ শব্দ হাওরের মাছ ও বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।