নিকলীতে এসি ল্যান্ড নন, যেন রাঘব বোয়াল। তিনি আর কেউ নন, বুয়েটের শিক্ষক ও ছাত্র পেটানোর ঘটনায় আলোচিত নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক বুয়েট শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক প্রতীক দত্ত। তিনি ৩৮তম বিসিএসের একজন ক্যাডার।
অনিয়ম ও অনৈতিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত থাকার সীমাহীন অভিযোগ সত্ত্বেও তিনি বহাল তবিয়তেই রয়েছেন। সুবিধার বিনিময়ে সরকারের স্বার্থ বিসর্জনের পাশাপাশি সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে পরোক্ষভাবে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
স্থানীয় বাসিন্দাসহ অসংখ্য ভুক্তভোগীর ভাষ্য, তিনি প্রায়ই দম্ভের সঙ্গে তার অতীতের মাস্তানি কর্মকাণ্ডের গল্প শোনান। এমনকি দম্ভ করে বলতে শোনা যায়, ‘বদলির বেশি কিছু করার ক্ষমতা এখানকার কারও নেই।’
স্থানীয়দের মতে, টাকার নেশায় তিনি মাতোয়ারা। সেবাগ্রহীতা থেকে শুরু করে অধীনস্থদের তটস্থ করে ফায়দা লোটার কৌশলে তিনি অত্যন্ত পারদর্শী। আইনি জটিলতার ভয়ে কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পান না। এসি ল্যান্ড পদে বহাল থাকলেও পুরো উপজেলা প্রশাসনে তার আধিপত্য বিস্তার করে চলেছেন। তার অতীত অপকর্ম নিয়েও অসংখ্য জাতীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
জানা গেছে, ‘সেই ভয়ংকর এসি ল্যান্ড’ শিরোনামেও তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমার তথ্য উঠে এসেছে অতীতের বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যম ও ডকুমেন্টারিতে। নিকলীতে যোগদানের আগে চলতি বছরের ১১ মার্চ ঠিকাদার পেটানোর ঘটনায় গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া থেকে তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। ঘটনার দুই দিন পর তিনি নিকলীতে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকেই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন ফায়দা লোটার লক্ষ্যে, যার ফলে সেখানকার সেবাগ্রহীতারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। নিকলীতে তার বিরুদ্ধে একাধিক কেস স্টাডিতে ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক সনদপ্রাপ্ত ভূমি সেবায় সরকার সাধারণ জনগণের সুবিধার কথা বিবেচনা করে ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ঘুষ-বাণিজ্য বন্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ভোগান্তি এড়াতে ভূমি সেবাকে অনলাইনভিত্তিক করা হয়েছে। ‘ভূমিসেবা ডিজিটাল, বদলে যাচ্ছে দিনকাল’—এমন স্লোগান থাকলেও অসাধু কর্মকর্তাদের কারণে নিকলীতে বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গণমাধ্যমকর্মীরাও তার অনিয়মের তথ্য তুলে ধরলে রোষানলের শিকার হচ্ছেন। রূপালী বাংলাদেশ পত্রিকার স্থানীয় প্রতিনিধি হৃদয় হোসাইনসহ একাধিক সাংবাদিক এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। গত ২ জানুয়ারি ‘ঘুষ ছাড়া ভূমি সেবা অচল’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর ৪ জানুয়ারি রাত ৯টা ৪৯ মিনিটে এবং এর আগেও একাধিকবার তার ব্যক্তিগত নম্বরে ফোন করে অফিসে যেতে বাধ্য করা হয়।
রাত ১২টার দিকে ভূমি অফিসে প্রবেশ করলে সেখানে স্থানীয় শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন বিএনপি নেতাকর্মীর উপস্থিতি দেখা যায়। তাদের সামনেই মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আপত্তি জানালে মামলা-মোকদ্দমাসহ নানা হয়রানির হুমকি দেওয়া হয়
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার দামপাড়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোছা. নাছিমা আক্তারের মতো একাধিক ইউনিয়নের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা এসি ল্যান্ডের আশকারা ও আঁতাতের সুযোগে অতিরিক্ত ফি ও ঘুষ বাণিজ্যে জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে।
সরকার নামজারির ফি ১ হাজার ১৭০ টাকা নির্ধারণ করলেও কৌশলে সামান্য ত্রুটি দেখিয়ে হয়রানির ভয় দেখিয়ে কারো কারো কাছ থেকে ৫০ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গুঞ্জন উঠেছে, হাওর অধ্যুষিত নিকলী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রতীক দত্তের সঙ্গে আঁতাতের মাধ্যমেই প্রায় সব ইউনিয়নের ভূমি সহকারী কর্মকর্তারা এ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অধীনস্থ কর্মকর্তা বলেন, ‘ওরা এসি ল্যান্ডের বলির পাঁঠা।’
দামপাড়া ইউনিয়নের আলিয়াপাড়ার কেরামত আলীর ছেলে বাচ্চু মিয়া ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া জমির নামজারি করতে গেলে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। একপর্যায়ে ২০ হাজার টাকায় মৌখিক চুক্তি হলে ১০ হাজার টাকা অফিসে বসেই নেওয়া হয়। পরে নামজারি না হওয়ায় টাকা ফেরত চাইলে তাকে ঘোরানো হয়। পরে সাংবাদিকদের তৎপরতায় অফিস সহকারী কাশেমের মাধ্যমে এক জনপ্রতিনিধির উপস্থিতিতে ওই টাকা ফেরত দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে নাছিমা আক্তার প্রথমে চুপ থাকেন। পরে স্বীকার করেন, অতিরিক্ত টাকা ছাড়া এসি ল্যান্ড ফাইলে স্বাক্ষর করেন না। তিনি বিষয়টি উল্লেখ না করার জন্য বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করেন এবং এসি ল্যান্ডের নানা অনিয়মের কথা বলতেও অপারগতা প্রকাশ করেন।
৫ নম্বর জারইতলা ইউনিয়নের আঠারবাড়িয়া এলাকার আলী হোসেন অভিযোগ করেন, আদালতে ত্রিমুখী মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও টাকার বিনিময়ে একটি পক্ষ নামজারি করে নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট জমিটি আঠারবাড়িয়া মৌজার আরএস ৭৪৭ ও ৭১৫ দাগভুক্ত। এ বিষয়ে অন্যান্য মামলাও চলমান রয়েছে। ভিপি জমি হওয়া সত্ত্বেও নামজারি করাকে সংশ্লিষ্ট নায়েব ভিপি (ক) ভুল বলে স্বীকার করেন।
জারইতলা ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হবি আহমেদ বুলবুল অনিয়মের বিষয়ে মুখ খুলতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং সংশ্লিষ্ট মিউটেশন সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান।
কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক ঘোড়াউত্রা নদীর তীরবর্তী প্রায় ৫০০ একর চরের মধ্যে প্রায় ২০০ একর সরকারি জমি অফিসে বসে সালিশ বৈঠকের মাধ্যমে ভাগাভাগি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরে পক্ষপাতিত্বের প্রশ্নে ১৭ নভেম্বর সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিনা নোটিশে একাধিক খামার উচ্ছেদ করা হয়, যাতে সাধারণ মানুষ ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হন। প্রতীক দত্ত দাবি করেন, অবৈধ উচ্ছেদে নোটিশের প্রয়োজন নেই।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, নিকলী সদরের নতুন বাজার এলাকায় একটি ঘর প্রথমে ভেঙে দেওয়া হলেও পরে রহস্যজনকভাবে আবার নির্মাণ করা হয় এবং ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রতীক দত্ত বলেন, ঘরটি সরকারি জায়গায় হওয়ায় সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
দামপাড়া বাজারের সরকারি জমি থেকে প্রকৃত মালিককে বঞ্চিত করে অন্যকে দখলের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ বিষয়ে প্রতীক দত্ত বলেন, বিষয়টি দেখে বলতে হবে।
এ ছাড়া টাকার পাশাপাশি প্রভাবশালী নেতাদের মন জয়ের জন্য হিস্যার অতিরিক্ত জমি নামজারির অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি কুর্শা মৌজায় একটি অনিয়মিত নামজারির প্রমাণও প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
হাওরে মাটি ও বালু কাটার বিষয়ে অভিযোগ থাকলেও প্রতীক দত্ত কৌশলে দায় এড়িয়ে চলছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রতীক দত্ত দাবি করেন, তিনি কারো কাছ থেকে টাকা নেননি এবং রেকর্ড পরিমাণ সরকারি আয় দেখিয়েছেন।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা জানান, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে।





সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন