ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সূর্যমুখী চাষে উদ্যোক্তা দিদারের মুখে সোনালি হাসি

মো. হাবিবুল ইসলাম রিয়াদ, সোনাগাজী (ফেনী) 
প্রকাশিত: মার্চ ১১, ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম
সূর্যমুখী চাষ করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন দিদার। ছবি : রুপালী বাংলাদেশ

ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার বগাদানা ইউনিয়নে সূর্যমুখী চাষ করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন পাইকপাড়া গ্রামের এবাদুল হকের ছেলে দিদার হোসেন। অনাবাদি পড়ে থাকা তিন বিঘা জমিতে এবারই প্রথম সূর্যমুখী চাষ করেছেন তিনি। 

ইতোমধ্যেই গাছে ফুল ধরতে শুরু করেছে। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে হলুদ ফুলের সমারোহ যেন হাসিমুখে সূর্যের আলো ছড়াচ্ছে। চারিদিকের এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন আশপাশের এলাকা থেকে ভিড় করছেন সৌন্দর্যপিপাসু মানুষ। অনেকে আবার ফুলের সঙ্গে ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখছেন।

উদ্যোক্তা দিদার হোসেন জানান, তিনি বিএসএস সম্পন্ন করে বর্তমানে এলএলবিতে অধ্যয়নরত। পূর্বে একটি ব্যবসার সাথে জড়িত থাকলেও পরবর্তীতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পে চাকরিতে যোগদান করেন। 

প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় তিনি বেকার হয়ে পড়েন এবং বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবে কৃষিতে মনোনিবেশ করেন। তিনি ও তার ছোট ভাই ছানাউল্যাহ মিলে নিজেদের জমানো সামান্য পুঁজিতে একটি খামার ঘর তৈরি করেন, যার নাম দিয়েছেন ‘মায়ের দোয়া এগ্রো এন্ড ডেইরি’। 

পরবর্তীতে অর্থ সংকুলান না হওয়ায় সোনাগাজী উপজেলা সমবায় অধিদপ্তরের শরণাপন্ন হয়ে ঋণ গ্রহণ করেন এবং সেই টাকায় দুটি গরু কিনে খামারের যাত্রা শুরু করেন। বর্তমানে তার খামারে ছোট-বড় মিলিয়ে ছয়টি গরু রয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ ও প্রণোদনা নিয়ে নিজের পতিত জমিতে সূর্যমুখী চাষ শুরু করেন দিদার। 

তিনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আলহামদুলিল্লাহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে পরিবারের সারা বছরের তেলের চাহিদা মিটিয়েও বিপুল পরিমাণ বীজ বিক্রি করতে পারব। এ ছাড়া গবাদি পশুর খাদ্যের জন্য প্রায় ৭০ শতক জমিতে ঘাস চাষ করেছি। 

তিনি আরও জানান, তার এলাকায় প্রায় ২০০ একর জমি সেচ সুবিধার অভাবে অনাবাদি পড়ে থাকে। পর্যাপ্ত সেচ ব্যবস্থা থাকলে এই জমিগুলোতে বছরে তিনবার ফসল উৎপাদন সম্ভব। 

দিদারের সফলতা দেখে স্থানীয় কৃষকরাও আগ্রহী হচ্ছেন, তবে সূর্যমুখী চাষে ৪-৫ বার সেচের প্রয়োজন হওয়ায় তারা সরকারি সহযোগিতা কামনা করছেন। 

দিদার বলেন, সেচ সমস্যার কথা উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা, কৃষি কর্মকর্তা ও ইউএনওকে জানিয়েছি। ভবিষ্যতে ভার্মি কম্পোস্ট ও বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

স্থানীয় এক কৃষক জানান, দিদার একজন শিক্ষিত যুবক হয়েও কৃষিকাজে যোগ দিয়ে আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। তাকে দেখে আমরাও আগামীতে সূর্যমুখী চাষে আগ্রহী হচ্ছি।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবার উপজেলায় প্রায় ৫০ হ্যাক্টর জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ হয়েছে। হ্যাক্টর প্রতি গড় লক্ষ্যমাত্রা ১.৮৬ ম্যাট্রিক টন হিসেবে মোট উৎপাদন ধরা হয়েছে ৯৩ ম্যাট্রিক টন, যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৯৩ লক্ষ টাকা।

এ বছর ৩১০ জন কৃষককে প্রণোদনা হিসেবে বীজ ও সার প্রদান করা হয়েছে। স্থানীয় তেল ভাঙানোর মেশিনগুলোতে কৃষকরা বীজ থেকে তেল সংগ্রহ করে নিজেদের চাহিদা মেটাচ্ছেন।

উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. হানিফ বলেন, দিদার হোসেন আমাদের নিবন্ধিত ‘গোধূলি সমবায় সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক। তিনি অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং একজন সফল উদ্যোক্তা হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন। সমবায় অফিসের পক্ষ থেকে তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাইন উদ্দিন আহমেদ সোহাগ বলেন, সূর্যমুখী তেল স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী এবং বাজারে এর ভালো চাহিদা রয়েছে। দিদার হোসেনের মতো প্রতিভাবান যুবকরা এগিয়ে এলে ভোজ্য তেলের আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। কৃষি অফিস থেকে তাকে সব ধরনের কারিগরি ও আনুষঙ্গিক সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।