রাজশাহীতে বিগত কয়েক বছর ধরে আলু চাষ করে লোকসান গুনছেন চাষিরা। বাধ্য হয়ে অনেক কৃষক অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। ফলে বিগত বছরের তুলনায় রাজশাহীতে এবার আলুর চাষ কম হয়েছে। তবে যে পরিমাণ জমিতে আলু চাষ হয়েছে ফলন ভালো পেলেও কৃষকরা এবারও আলুর কাঙ্খিত দাম পাচ্ছেন না। এতে আলু নিয়ে কৃষকের মুখে হতাশার ছাপ। ফলন ভালো হলেও হাঁসি নেই কৃষকের মুখে।
নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৯ টাকা থেকে ১০ টাকায়। এতে আলু বিক্রি করে উৎপাদন খরচ উঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজশাহী বাগমারা উপজেলার আলু চাষি আমজাদ আলী মৃধা জানান, বিগত বছর লোকসান খেয়ে তিনি এবার অল্প পরিসরে এক বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। তুলনামূলক ভালো ফলনও পেয়েছেন। প্রতি বিঘায় ৪০ থেকে ৪৫ বস্তা (প্রতি বস্তা ৬০ কেজি) আলু উৎপাদন হয়েছে। এখন বাজারে প্রতিবস্তা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি বিঘায় ২৪ হাজার থেকে ৩১ হাজার টাকার আলু বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু আলু উৎপাদন করতে বিঘাপ্রতি ব্যয় হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। মৌসুমের শুরুতে এবারও আলুর দাম নেই। লোকসান গুনতে হচ্ছে বিঘা প্রতি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা।
রাজশাহী পবা উপজেলার বজরাপুর গ্রামের আলু চাষি ওয়াজেদ মিয়া জানান, তিনি এবার আড়াই বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। তার বিঘাপ্রতি প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু বিঘাপ্রতি আলু বিক্রি করে পাচ্ছেন ৩০ হাজার টাকা। তার ভাষায়, ‘বিঘায় ৩২ হাজার টাকা লোকসান হলে পথে বসা ছাড়া উপায় নেই।’
কৃষকদের অভিযোগ, ৭০ কেজির বস্তা লোড হলেও ৬৫ কেজির দাম দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতি বস্তায় ৫ কেজি করে অতিরিক্ত আলু দিতে হচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের লাভ হিসেবে ধরা হচ্ছে। এতে বিঘাপ্রতি প্রায় ২৫০ কেজি আলু অতিরিক্ত চলে যাচ্ছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার ৩৭৫ টাকা।
ব্যবসায়ীরা জানান, জমি থেকে এসব আলু কিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়ে বিক্রি করা হবে। সেখানে কেজিপ্রতি ১ থেকে ২ টাকা বেশি দাম পাওয়া যেতে পারে। ঢলনের বিষয়ে তারা বলেন, জমি থেকে কাঁচা আলু কেনা হয়। পরিবহন ও সংরক্ষণের সময় ওজন কমে যায় বলেই অতিরিক্ত নিতে হয়।
আলু ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন বলেন, গতবারের মতো এবারও আলু চাষে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। অনেকেই ঋণ করে জমির পরিমাণ কমিয়ে আবার আলু চাষ করেছেন, কিন্তু এবারও লোকসান গুনতে হচ্ছে। বর্তমানে জেলায় আলু উঠানো প্রায় শেষের পথে। এরপরও আলুর দাম না বাড়ায় কৃষকেরা চরম শষ্কায় রয়েছেন।
জেলার কৃষকরা গত বছর আলু বিক্রি করে লোকসানের কারণে এবার রাজশাহীতে প্রায় ৪ হাজার ২৯১ হেক্টর জমিতে আলু চাষ কমে গেছে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর রাজশাহী জেলায় ৩৮ হাজার ৫৭১ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল। কিন্তু লোকসানের কারণে এবার তা কমে ৩৪ হাজার ২৮০ হেক্টরে ঠেকে গেছে। জেলার সবচেয়ে বেশি ও ভালো জাতের আলু চাষ হয় তানোর উপজেলায়। সেখানকার চাষিরাও এবার আলু চাষ কম করেছেন। গত বছর তানোরে ১৩ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল। এবার হয়েছে ১২ হাজার ১৯০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ।
তানোর উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানান, এবারে উপজেলায় ১২ হাজার ১৯০ হেক্টর জমিতে আলু করা হয়। ইতোমধ্যে আলু তোলা প্রায় শেষ হয়েছে। হেক্টরপ্রতি গড়ে ২৫ মেট্রিক টন ফলন হচ্ছে। দামের বিষয়ে তিনি বলেন, কৃষি বিভাগ চাষাবাদ ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে কাজ করে; বাজারদর নির্ধারণের বিষয়টি কৃষি বিপণন বিভাগের দায়িত্ব।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন জানান, রাজশাহী জেলায় অতিরিক্ত আলু চাষ করার কারণে চাষিরা লোকসানে খেয়েছেন। তাই সরকার ‘ক্রপ জোনিং’ পদ্ধতি অর্থাৎ যে এলাকায় যে মাটিতে যে ধরনের ফসল ভালো হয়, সেখানে সেই ধরনের ফসল চাষ করার পরামর্শ প্রদান করবে। এটিই ক্রপ জোনিং পদ্ধতি। পরীক্ষামূলকভাবে এটি শুরু করা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়ন হলে চাষিদের লোকসান গুনতে হবে না বলে আশা করা হচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন