নোয়াখালীতে অনিয়মের মাধ্যমে খাল ও ফসলি জমির মাটি কেটে আলেকজান্ডার-সোনাপুর-মান্নান নগর সড়কের পাশ প্রশস্তকরণের কাজ চলছে। এতে কোনো ধরনের সুরক্ষা দেয়াল না থাকায় খালপাড়ের সড়ক ও মানুষের বাড়িঘর ধসে পড়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
নোয়াখালী সড়ক ও জনপদ বিভাগের তথ্যমতে, লক্ষ্মীপুর চর আলেকজান্ডার-সোনাপুর-মান্নান নগর সড়কের মোট ৭৩ কিলোমিটারের মধ্যে নোয়াখালী অংশে ১৮ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার ও প্রশস্তকরণের কাজ চলছে। এই অংশের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৬ কোটি টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রিয়াভেল বিল্ডার্স।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সদর উপজেলার মান্নান নগর, হানিফ চেয়ারম্যান বাজার, নুরুপাটোয়ারীর হাট এবং সুবর্ণচরের চেওয়াখালী বাজার থেকে আজাদ নগর পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) খাল এবং মানুষের বাড়ির বাগান ও ফসলি জমি থেকে ভেকু দিয়ে মাটি তুলে সড়কের পাশ প্রশস্ত করা হচ্ছে। বাদ পড়েনি মসজিদের জমিও। এতে খালের গভীরতা বেড়ে সড়ক ও মানুষের বাড়িঘর পুনরায় খালের মধ্যে ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে ফসলি জমির মাটি কাটা নিষিদ্ধ থাকলেও এই সড়কের পাশ ঘেঁষে ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল) কেটে নেওয়ায় জমির উর্বরতা নষ্ট হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে মাটি কাটার ফলে খালের ওপর থাকা ছোট-বড় অর্ধশতাধিক পোল ও কালভার্টও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ঠিকাদার সড়কের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া পাউবোর খাল থেকে ভেকু দিয়ে মাটি তুলে সড়কের পাশ প্রশস্ত করছেন। এতে খালের গভীরতা বেড়ে যাওয়ায় সড়ক ও বাড়িঘর ধসে আবার খালের মধ্যে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, সড়কের অপর পাশের ফসলি জমি, বাড়িঘর, বাগান ও মসজিদের জায়গা থেকেও মাটি কাটা হচ্ছে। তাদের দাবি—ঠিকাদারের লোকজনকে সড়কসংলগ্ন খাল ও ফসলি জমি থেকে মাটি তুলতে নিষেধ করা হলেও তারা তা মানছেন না। ঠিকাদার প্রভাবশালী হওয়ায় দুই দফা কাজ বন্ধ করেও কোনো লাভ হয়নি; তারা পুনরায় কাজ শুরু করেন। এ বিষয়ে নোয়াখালী সড়ক ও জনপদ বিভাগে জানিয়েও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। তাদের অভিযোগ—সড়ক প্রশস্তকরণের নামে খাল ও ফসলি জমি কেটে ‘সাগর চুরি’ করা হচ্ছে।
ঠিকাদারি কাজের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় এক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, এই সড়কটি নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর জেলার আঞ্চলিক সড়ক। দরপত্রে ভিন্ন স্থান থেকে মাটি সংগ্রহ করে সড়কটি প্রশস্তকরণের নির্দেশনা থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অনিয়মের মাধ্যমে সড়ক বিভাগের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে প্রভাব খাটিয়ে পাশের খাল ও ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে সড়ক প্রশস্ত করছে। এটি সম্পূর্ণ অনিয়ম ও দুর্নীতি, যা দেখেও না দেখার ভান করছেন সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা।
তবে এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রিয়াভেল বিল্ডার্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সংযোগ না পাওয়ায় তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
নোয়াখালী সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফরিদ উদ্দিন আলেকজান্ডার-সোনাপুর-মান্নান নগর সড়কের পাশ প্রশস্তকরণে অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, সরেজমিনে গিয়ে খাল ও ফসলি জমি কেটে মাটি নিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বারণ করা হয়েছে। এখন শুনছি পুনরায় খাল ও ফসলি জমি থেকে মাটি কাটা হচ্ছে। এ বিষয়ে সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঠিকাদারকে যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, সেই শর্ত অনুযায়ী কাজটি বাস্তবায়ন করার কথা। তবে শর্ত ভঙ্গ করে কোনো অবস্থাতেই সরকারি জমি, খাল বা অন্য কোনো সম্পত্তি থেকে কিংবা ফসলি জমি থেকে অন্যায়ভাবে মাটি কাটা যাবে না। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সরেজমিনে ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
এদিকে খাল ও ফসলি জমি কাটার ফলে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রিয়াভেল বিল্ডার্সের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণসহ তাদের ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন