গাজীপুরে আঙুর চাষে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছেন পেশায় প্রকৌশলী রুকুনুজ্জামান সিকদার। থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা সবুজ আঙুরে ভরে উঠেছে তার বাগান, যা ইতোমধ্যেই স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। ইউক্রেনের ‘বাইকুনু’ জাতের আঙুর চাষ করে তিনি দেখিয়েছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও পরিচর্যা থাকলে দেশীয় পরিবেশেও বাণিজ্যিকভাবে আঙুর উৎপাদন সম্ভব।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ছায়াঘেরা বিপ্রবর্তা এলাকায় এক সময় বহু জমি পতিত পড়ে থাকত। করোনা মহামারির সময় ইউটিউব ও বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে আধুনিক কৃষি পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান নিয়ে সেই পতিত জমিই লিজ নিয়ে কৃষি খামার গড়ে তোলেন রুকুনুজ্জামান। শুরুতে মাল্টা, ড্রাগন ও প্যাশন ফ্রুট চাষে সফলতা পাওয়ার পর ধাপে ধাপে তিনি খামার সম্প্রসারণ করেন। বর্তমানে প্রায় ৫ একর জমিতে বিভিন্ন ফলের চাষাবাদ করছেন তিনি।
এই ধারাবাহিকতায় এক বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে ‘বাইকুনু’ জাতের আঙুর চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তার বাগানে ১৮ মাস বয়সি দুই শতাধিক গাছে থোকায় থোকায় আঙুর ঝুলছে। প্রতিটি গাছেই ফলনের পরিমাণ সন্তোষজনক। আর মাত্র এক মাসের মধ্যেই ফল পাকতে শুরু করবে এবং সবুজ থেকে বেগুনি রং ধারণ করবে। উদ্যোক্তার দাবি, স্বাদে এই আঙুর বেশ মিষ্টি ও মানসম্মত, যা বাজারজাত করলে ভালো দাম পাওয়া যাবে।
রুকুনুজ্জামান সিকদার বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে আঙুর চাষের জন্য জমি প্রস্তুত, উন্নতমানের চারা সংগ্রহ, মাচা নির্মাণ, সার প্রয়োগ ও নিয়মিত পরিচর্যা মিলিয়ে প্রায় চার লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে প্রথম ফলন বিক্রি করেই সব খরচ উঠে আসবে বলে তিনি আশাবাদী। একই গাছ থেকে পরবর্তী বছরগুলোতেও ধারাবাহিকভাবে ফলন পাওয়া যাবে, যা বিনিয়োগকে আরও লাভজনক করে তুলবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আঙুর চাষে সঠিক পরিচর্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট সময় পরপর ছাটাই, সার প্রয়োগ, কীটনাশক ব্যবহার এবং সেচ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হয়। তার বাগানে মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, যা মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করে এবং আগাছা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। গত ১৮ মাসে প্রায় ১০ বার জৈব ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা হয়েছে এবং নিয়মিত পানি দেওয়া হচ্ছে।’
বাগানে কর্মরত শ্রমিকরা বলেন, এ খামারে কাজ করে তারা নিয়মিত আয় করার পাশাপাশি আধুনিক কৃষি পদ্ধতি শিখতে পারছেন। এতে তাদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হচ্ছে, ভবিষ্যতে নিজেরা এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাগানটির ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিদিনই শত শত মানুষ ভিড় করছেন আঙুর বাগানটি দেখতে। অনেকেই সরেজমিনে দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন এবং আঙুর চাষে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও এটি নিয়ে নতুন করে উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গাজীপুরের উপ-পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আঙুর বাগানটির বিষয়ে তাদের একটি টিম পরিদর্শন করেছে। উদ্যোক্তাকে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ বাড়লে দেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কৃষিতে বহুমুখীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি নতুন ফল চাষে উদ্যোগী হলে কৃষকের আয় বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সব মিলিয়ে গাজীপুরে আঙুর চাষ এখন শুধু একটি সফল উদ্যোগ নয়, বরং সম্ভাবনাময় কৃষির নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত। সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে দেশীয়ভাবেই আঙুর উৎপাদন সম্ভব। এমনই এক বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছেন প্রকৌশলী রুকুনুজ্জামান সিকদার।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন