মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলায় বজ্রপাতে নিহত এক যুবকের কবরকে ঘিরে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা সামনে এসেছে। বজ্রপাতে কেউ মারা গেলে তার লাশ চুরি হয়। এমন আশঙ্কা থেকেই ছেলের লাশ ‘চুরি হয়ে যেতে পারে’— এই ভয়ে টানা এক সপ্তাহ ধরে রাত জেগে কবর পাহারা দিচ্ছেন বৃদ্ধ বাবা। এমনকি কবরটি লোহার খাচা দিয়ে আবৃত করে নিরাপদ করার চেষ্টা করেছেন তিনি। পাশাপাশি লোক রেখেও পাহারা দেওয়ার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
গত বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) দুপুরে টঙ্গীবাড়ী উপজেলায় বজ্রপাতে আরাফাত খানসহ দুজনের মৃত্যু হয়। পরে আরাফাত খানের ছেলে সাকিব খানকে কামারখাড়া সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
দাফনের পর থেকেই প্রতিরাতে কবরের পাশে বসে পাহারা দিচ্ছেন নিহত যুবকের বাবা জসিম খান। শুধু তাই নয়, নিরাপত্তার জন্য তিনি কবরটিকে লোহার খাঁচা দিয়ে ঘিরে ফেলেছেন এবং কিছু মানুষ ভাড়া করেও পাহারার ব্যবস্থা চালিয়ে যাচ্ছেন।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) রাত সাড়ে ৯টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, কামারখাড়া সামাজিক কবরস্থানে লোহার খাঁচায় ঘেরা কবরের পাশে নীরবে বসে আছেন জসিম খান।
তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে দর্জির কাজ করে সংসার চালাত। গরুর জন্য ঘাস কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যায়। শুনেছি, বজ্রপাতে মারা গেলে লাশ চুরি হয়ে যায়, হাড়-গোড় নাকি বিভিন্ন কাজে লাগে। এই ভয়েই কবর পাহারা দিচ্ছি।’
তিনি আরও জানান, শারীরিকভাবে অসুস্থ হওয়ায় সারাক্ষণ নিজে থাকতে পারেন না। দুই ছেলের মধ্যে আরাফাত ছিল বড় সন্তান। সংসারের টানাপোড়েনের মধ্যেও ঋণ করে লোক ভাড়া করে পাহারা দিতে হচ্ছে তাকে।
‘ছোট ছেলের বয়স মাত্র ১২ বছর। এলাকায় কেউ কেউ সাহায্য করলেও সবসময় সম্ভব হয় না। প্রশাসন যদি পাহারার ব্যবস্থা করত, একটু স্বস্তি পেতাম,’—বলেন তিনি।
এ ঘটনায় স্থানীয়রা মানবিক কারণে পরিবারটির পাশে দাঁড়ালেও বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা চলছে। অনেকে বলছেন, প্রশাসনের সহায়তা আরও বাড়ানো দরকার।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার জানান, নিহত পরিবারের দাফন-কাফনের জন্য ইতোমধ্যে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে গ্রাম পুলিশকে কবরস্থানে নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আরও সহায়তা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তির লাশ চুরি হওয়ার ধারণা একটি ভিত্তিহীন কুসংস্কার, যার বৈজ্ঞানিক কোনো প্রমাণ নেই। তবে গ্রামীণ কিছু এলাকায় এ ধরনের ভ্রান্ত ধারণা এখনো প্রচলিত রয়েছে।
একই সঙ্গে জানা যায়, কিছু অসাধু চক্র কবর থেকে লাশ বা হাড়গোড় চুরির ঘটনা ঘটিয়ে তা বিক্রির অপচেষ্টা চালায়—এমন ঘটনাও অতীতে সামনে এসেছে।

