১৪৪ ধারা ভঙ্গকরে ডিগ্রি পরীক্ষা চলাকালীন কলেজে হামলা চালিয়ে এক শিক্ষিকাকে জুতাপেটা, অফিস কক্ষ ভাঙচুর ও অধ্যক্ষসহ কয়েকজন শিক্ষককে বেধড়ক মারপিট করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
হামলার আশঙ্কার খবর জানতে পেরে দুর্গাপুর থানার ওসি অতিরিক্ত পুলিশ নিয়ে কলেজে উপস্থিত হয়ে শিক্ষক ও স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে দফায় দফায় কথা বললেও পুলিশের সামনেই অধ্যক্ষসহ কয়েকজন শিক্ষকের ওপরে অতর্কিত হামলা ও কলেজের অফিস কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর ঘটনা ঘটে। হামলায় কলেজ অধ্যক্ষসহ অন্তত পাঁচজন শিক্ষক আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
আহত শিক্ষকরা বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা নিয়েছেন। ঘটনার পর পুরো কলেজ চত্বরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কলেজে অংশ নেওয়া ডিগ্রি পরীক্ষার্থীদের মধ্যেও আতঙ্ক দেখা দেয়। এ সময় পরীক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত কয়েকজন শিক্ষক, পরীক্ষার্থী ও হামলার শিকার শিক্ষকরা প্রাণভয়ে আত্মরক্ষার্থে কলেজ থেকে পালিয়ে যান। তবে পুরো ঘটনার সময় থানার ওসিসহ দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা ছিলেন।
বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে এ ঘটনা ঘটেছে। কলেজে ওই সময় ২০২৪ সালের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা চলছিল। ফলে পরীক্ষাকেন্দ্র বিবেচনায় কলেজ ও আশেপাশের ১০০ গজের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি করেছিলেন প্রশাসন। এমনকি ডিগ্রি পরীক্ষা উপলক্ষে সকাল থেকেই কলেজে পুলিশ মোতায়েন ছিল।
পুলিশ, কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুরের দিকে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা কলেজের অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করেন। নানা বিষয় নিয়ে অধ্যক্ষসহ অন্যান্য শিক্ষকদের সঙ্গে বাকবিতন্ডায় জড়ান বিএনপির নেতাকর্মীরা। এক পর্যায়ে শিক্ষকদের ওপরে হামলা চালায় বিএনপির নেতাকর্মীরা। এমনকি শুধু শিক্ষকদের ওপরে হামলা চালিয়েই ক্ষান্ত হননি বিএনপির নেতাকর্মীরা। তারা কলেজের অফিস কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়।
বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলায় আহতরা হলেন- কলেজ অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক, নারী প্রভাষক আলেয়া খাতুন হীরা, অধ্যাপক রেজাউল করিম আলমসহ কলেজের আরও দুই কর্মচারী। আহতদের মধ্যে অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক ও আলেয়া খাতুন হীরার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর বলে জানা গেছে।
বিএনপির নেতাকর্মীরা ঘটনার পর সরে গেলে কলেজের অন্যান্য শিক্ষকরা এগিয়ে গিয়ে আহত শিক্ষকদের উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান।
আহত শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলী, জয়নগর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড ব্রহ্মপুর গ্রামের বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আফাজ আলী, ইউনিয়ন বিএনপি নেতা ও মৎস্য ব্যবসায়ী শাহাদ আলী, জয়নগর ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি জয়নাল আলী, ৪ নম্বর ওয়ার্ড দাওকান্দি বিএনপির সভাপতি এজদার আলী, জয়নগর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি রুস্তম আলী, ছাত্রদল নেতা জামিনুর ইসলাম জয়সহ স্থানীয় এবং ইউনিয়ন বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন নেতাকর্মী হামলায় অংশ নেন।
ঘটনার পর দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও আশেপাশের এলাকাজুড়ে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা চালালেও পুরোপুরি সক্ষম হননি।
অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তিনি সরকারি আদেশে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তার কাছে বিভিন্ন সময় কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করে আসছিল বিএনপির নেতাকর্মী। বিএনপির নেতাকর্মীদের ভালোভাবে চিনেন না বলেও জানান তিনি।
আলেয়া খাতুন হীরা অভিযোগ করেন, বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে প্রায় কলেজে এসে হিসাব-নিকাশ চাইতেন। আসলে তারা চাঁদার দাবিতে আসত। অধ্যক্ষ নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন বিধায় কোনো পক্ষকেই সেইভাবে গ্রহণ করতেন না। এটাই অপরাধ ছিল অধ্যক্ষের। আর একজন শিক্ষক বা সহকর্মী হিসেবে অধ্যক্ষকের পাশে থাকাটাই আমার অপরাধ। আমি এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা হয়েও কেন অধ্যক্ষ মহোদয়ের পক্ষ নিয়েছি এটাও আমার একটা অপরাধ।
স্থানীয় বিএনপির এক নেতা বলেন, এই কলেজে দীর্ঘ সময় অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে কলেজের জমি, গাছপালা বিক্রিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি করেছেন মোজাম্মেল হক। সেই সময়ের হিসাবের ফিরিস্তি বারবার চাইলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের দেয়নি। উল্টো আমাদের ভয় ভীতি দেখান। এমনকি ঘটনার দিনে কলেজের শিক্ষক আলেয়া খাতুন হীরা প্রথমে আমাদের ওপরে হামলা করেন এবং কয়েকজন নেতাকর্মীকে চড়-থাপ্পড় মারেন। যার ফলশ্রুতিতে নেতাকর্মীরা ক্ষিপ্ত হয়ে কয়েকজন শিক্ষককে মারধর করেছে এবং অফিস কক্ষ অফিস ভাঙচুর করেছে।
দুর্গাপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম বলেন, পরীক্ষা চলাকালীন দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে কেন্দ্র হিসেবে ও আশেপাশের ১০০ গজের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি ছিল। অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটতে পারে এমন সংবাদ পেয়ে কলেজে গিয়ে শিক্ষক ও স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে দফায় দফায় দফায় কথা বলে তাদের নিবৃত করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমিসহ আমার পুলিশ সদস্যরা বাধা দেওয়ার পরেও কিছু লোকজন কলেজে অনধিকার প্রবেশ করে হামলা ও ভাঙচুর চালায়।
এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন