ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মৌসুমের আগেই বাজারে অপরিপক্ব আম-লিচুতে সয়লাব

রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশিত: মে ১৩, ২০২৬, ০১:৫৭ পিএম
বাজারে অপরিপক্ব আম-লিচুতে সয়লাব। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন বাজার ও ভ্রাম্যমাণ দোকানে মৌসুমের আগেই উঠতে শুরু করেছে আম ও লিচু। এসব ফলের বেশিরভাগই অপরিপক্ব। ক্রেতারা বলছেন, অপরিপক্ব মৌসুমি ফলের তেমন স্বাদ না থাকলেও ব্যবসায়ীরা চড়া দামে বিক্রি করছেন। বিক্রেতারা বলেছেন, বেশি দামে পাইকারি কেনায় খুচরা বাজারেও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

মৌসুমের শুরুতেই এসব ফল কিনতে নগরীর বিভিন্ন বাজারে ভিড় করছেন ক্রেতারা। বিশেষ করে রাজশাহীর হড়গ্রাম বাজার, কোর্ট এলাকা, সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, শালবাগান ও উপশহর নিউমার্কেট এলাকায় এখন দেশি লিচু ও আগাম জাতের আমের জমজমাট বেচাকেনা চলছে।

কৃষি বিভাগ বলছে, এখন পর্যন্ত লিচু পরিপক্ব হয়নি। পরিপক্ব লিচু আসতে এখনো ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগবে। এরপর বাজারে পরিপক্ব লিচু পাওয়া যাবে। চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে ৫২৮ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮০০ টন।

লিচুচাষিরা জানান, তাপপ্রবাহ ও প্রচণ্ড খরায় বেশিরভাগ গাছের লিচু ঝরে পড়েছে। অবশিষ্ট লিচুর কিছু ফেটে নষ্ট হয়েছে। মৌসুমে গাছে গাছে প্রচুর মুকুল এসেছিল। গুটি এলেও বৃষ্টির দেখা মেলেনি; বরং প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ ও খরায় লিচু ফেটে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে ব্যাপক লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন বাগানমালিক ও ব্যবসায়ীরা।

রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, ভ্রাম্যমাণ দোকান বসিয়ে সবুজ ও হালকা লাল রঙের আম ও লিচু বিক্রি হচ্ছে। বছরের নতুন ফল হিসেবে অনেক ক্রেতার নজরই লিচুর দিকে। ১০০টি লিচু বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। পরিপক্ব লিচুর তুলনায় এগুলো আকারে ছোট। আকারে একটু বড় হলেই দাম বেশি চাওয়া হচ্ছে। অনেক ক্রেতাই শিশুদের আবদার মেটাতে এসব লিচু কিনছেন বলে জানান।

বিক্রেতারা বলছেন, তারা আগে থেকেই বাগান কিনে রেখেছেন। বাগানমালিকদের পুরো টাকা পরিশোধ করেননি। মালিকদের পাওনা পরিশোধের চিন্তা এবং ঝড়বৃষ্টি হলে লিচুর ক্ষতি হতে পারে- এমন আশঙ্কা থেকে তারা আগেভাগেই লিচু বিক্রি করছেন।

নগরীর ভদ্রা এলাকায় লিচু বিক্রি করছিলেন ইয়াসিন আলী। তিনি বলেন, এখন যেসব লিচু বাজারে আছে, সেগুলো পুরোপুরি মিষ্টি নয়। কিছুটা টক-মিষ্টি স্বাদের। মিষ্টি লিচু আরও এক-দুই সপ্তাহ পরে আসবে। কিন্তু লিচুগাছের মালিক ও বাগানমালিকদের পাওনা পরিশোধ করতে অনেকে লিচু পেড়ে বিক্রি করছেন। আমি একটি লিচুগাছ কিনেছি সাড়ে ৫ হাজার টাকায়। গাছের সব লিচু খুচরা হিসেবে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি করতে পারব। এতে খরচ বাদে ৪ থেকে ৬ হাজার টাকা লাভ হবে।

নগরীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে ভ্যানে লিচু বিক্রি করছিলেন জামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, আমি দুই খাঁচা লিচু নিয়ে এসেছি। চাহিদা মোটামুটি ভালোই। ১০০টি লিচু ৪০০ টাকা করে বিক্রি করা যাচ্ছে। কমপক্ষে এক সপ্তাহ পর আরও ভালো লিচু বিক্রি করতে পারব। সেগুলোর রঙ টকটকে হবে এবং স্বাদও মিষ্টি হবে।

মহানগরীর ছোট বনগ্রাম, রায়পাড়া, পবা, পুঠিয়া ও মোহনপুর উপজেলার কয়েকটি বাগান ঘুরে দেখা গেছে, বোম্বাই, মাদ্রাজি, কাদমি, মোজাফফরপুরী, বেদানা, কালীবাড়ি, মঙ্গলবাড়ী, চায়না-৩, বারি-১, বারি-২ ও বারি-৩ জাতের লিচু চাষ হয়েছে। তবে ঝরে পড়ায় ফলন খুব কম।

রাজশাহীর পবা উপজেলার লিচুচাষি শাহরিয়ার হোসেন বলেন, আমার ৭০টি লিচুগাছে মুকুল এলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে ঝরে গেছে। যেগুলো আছে, সেগুলো এখনো পরিপক্ব হয়নি। কিন্তু রোদের প্রখরতায় লিচু ফেটে নষ্ট হয়ে গেছে। আগাম জাতের কিছু লিচু পাকতে শুরু করায় বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে।

ভদ্রায় লিচু কিনতে আসা রোখসানা পারভীন বলেন, আত্মীয়ের বাড়িতে যাচ্ছি, তাই লিচু কিনতে এসেছি। অন্যান্য কিছু ফল নিয়েছি, সঙ্গে লিচুও নিলাম। দোকানদার একটি লিচু পাকা ও টসটসে দেখালেন। কিন্তু আমাকে যেগুলো দিলেন, মনে হয় না পাকা হবে। ১০০টি লিচুর দাম নিলেন ৩০০ টাকা।

একটি ওষুধ কোম্পানিতে কর্মরত ইলিয়াস হোসেন বলেন, আমার দুই বাচ্চা লিচু খুব পছন্দ করে। তাই এখান থেকে লিচু নিলাম। যদিও লিচুগুলো টক লাগল, কিন্তু বাচ্চাদের জন্য শখ করে কিনলাম।

বিক্রেতারা জানান, বর্তমানে বাজারে দেশি লিচু সীমিত পরিমাণে আসায় দাম কিছুটা বেশি। প্রতি ১০০টি দেশি লিচু ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া বাজারে উঠতে শুরু করেছে গুটি, গোলাপখাস, বৃন্দাবনী ও কাটিমন জাতের বৈশাখী আম। আমের মান ও আকারভেদে প্রতি কেজি ১৫০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ক্রেতারা বলছেন, গরমের মধ্যে মৌসুমি ফলের স্বাদ নিতে অনেকেই আগাম লিচু ও আম কিনছেন। তবে সরবরাহ কম থাকায় দাম এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়েছে।

জেলা প্রশাসন আগামী ১৫ মে থেকে গুটি আম সংগ্রহ ও বাজারজাত করার অনুমতি দিয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে বাজারে আসবে গোপালভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি ও ফজলি জাতের আম। কিন্তু তার আগেই বাজারে তোলা হয়েছে অপরিপক্ব আম ও লিচু।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শঙ্কর কুমার বিশ্বাস বলেন, অপরিপক্ব কোনো ফলই খাওয়া উচিত নয়। লিচুর ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকতে হবে। অপরিপক্ব লিচু অনেক সময় ওষুধ দিয়ে পাকানো হয়। এসব ফল খাওয়ার ফলে পেটে খিঁচুনি বা ব্যথা হতে পারে। এমনকি এতে ক্যানসারের ঝুঁকিও থাকতে পারে।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, অনেক বাগানের লিচু এখনও পুরোপুরি পাকেনি। লিচু পরিপক্ব হতে আরও এক-দুই সপ্তাহ সময় লাগবে। আমরা বাগানমালিক ও পাইকারদের প্রতিনিয়ত পরামর্শ দিচ্ছি, যেন ফল পরিপক্ব হলেই তারা বিক্রি করেন। মৌসুমের প্রথম লিচু হওয়ায় বিক্রেতারা কিছুটা বেশি দাম নিচ্ছেন। তবে সরবরাহ বাড়লে দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে।