কুমিল্লার লাকসাম উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে চরম জরাজীর্ণ ও বেহাল দশায় পড়ে রয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকলেও এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের ভেতরেই প্রতিদিন চলছে জমি কেনাবেচা ও দলিল নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কার্যক্রম। ফলে কর্মকর্তা, কর্মচারী, দলিল লেখকসহ প্রতিদিন আসা শত শত সেবাগ্রহীতাকে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটির দেয়াল ও ছাদের বিভিন্ন অংশের প্লাস্টার ধসে পড়ছে। বর্ষাকালে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ার কারণে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, বালাম বই এবং কম্পিউটারসহ বিভিন্ন সরকারি সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ভবনের মেঝেতে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং দরজা-জানলাগুলোও ভাঙ্গাচুরা। সামান্য বৃষ্টি হলেই অফিসের আশপাশে পানি জমে একাকার হয়ে যায়, তখন চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়ে। রেকর্ড রুমটির অবস্থাও শোচনীয়। অনিরাপদ পরিবেশ এবং ছাদ থেকে পানি পড়ার উপক্রম হওয়ায় বহু বছরের পুরোনো গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র ও বালাম বই নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এগুলো একবার নষ্ট হলে এলাকার সাধারণ মানুষজন স্থায়ীভাবে ব্যাপক ভূমি বিরোধের সম্মুখীন হবেন বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জমি রেজিস্ট্রি করতে এসে সারাক্ষণ ভয়ে থাকতে হয়, কখন মাথার ওপর ছাদ ভেঙে পড়ে। আর একটু বৃষ্টি হলেই নাজুক অবস্থা। এত রাজস্ব আদায় হয় এই অফিস থেকে, অথচ ভবনের এই দশা! কার্যালয়টিতে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের জন্য নেই কোনো উন্নত বসার ব্যবস্থা বা বিশুদ্ধ খাবার পানির সুব্যবস্থা। বিশেষ করে দূর-দূরান্ত থেকে আসা নারী ও বয়োবৃদ্ধ সেবাগ্রহীতারা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। খোলামেলা একমাত্র শৌচাগারটিও দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারের অনুপযোগী ও নোংরা হয়ে পড়েছে।
অফিসে কর্মরত স্টাফ এবং দলিল লেখকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এখানে কাজ করতে আসেন। মাথার ওপর কখন ছাদ ভেঙে পড়ে, এই আতঙ্কে সবসময় তটস্থ থাকতে হয়। স্থানীয় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকারকে আমরা লাখ লাখ টাকা ট্যাক্স (রাজস্ব) দিচ্ছি, কিন্তু একটা ভালো ভবনের অভাবে আমাদের চোরের মতো বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বৃষ্টি আসলে মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকে না। মনে হয় আমরা আদিম যুগের কোনো পরিত্যক্ত রাজা-বাদশাদের গোয়াল ঘরে আছি।’
লাকসাম দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম খন্দকার জানান, এই সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব সরকারের কোষাগারে জমা হয়। কিন্তু ভবনটির সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণের কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। ভাঙা ছাদের নিচে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার স্ট্যাম্প ও দলিলের কাজ করতে হচ্ছে।
অফিস সূত্রে জানা গেছে, লাকসাম সাব-রেজিস্ট্রি অফিস কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট কোনো সাল সরকারি নথিতে বা অনলাইনে উন্মুক্ত নেই। তবে লাকসাম এলাকাটি যখন ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ বা তার পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক থানা হিসেবে গঠিত হয়, সেই ব্রিটিশ আমলের শুরু থেকেই জমি রেজিস্ট্রেশনের জন্য এই অফিসের কার্যক্রম চলে আসছে বলে ধারণা করা হয়। প্রথমে ছনের ঘর (এক ধরনের শক্ত ঘাসের) ঘরে কার্যক্রম চললেও বহু বছর আগে এটিকে দুই রুমের একটি পাকা দালানে রূপান্তরিত করা হয়। এটি এখন পরিত্যক্ত প্রায়। ভবনের এই জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে একাধিকবার জানানো হয়েছে। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ অথবা বিকল্প কোনো নিরাপদ স্থানে অফিসটি সাময়িকভাবে স্থানান্তর করা না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।
লাকসামের সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের দাবি, জনস্বার্থে এবং সরকারি নথিপত্রের সুরক্ষায় অনতিবিলম্বে এই জরাজীর্ণ ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে একটি আধুনিক ও সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত নতুন সাব-রেজিস্ট্রি ভবন নির্মাণ করা হোক।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন