রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধ এবার রূপ নিয়েছে পরিবহন অচলাবস্থায়। জেলা প্রশাসনের সমঝোতার উদ্যোগ ব্যর্থ করে আন্দোলনরত শ্রমিকদের একাংশ রাজশাহীর সঙ্গে সারা দেশের আন্তঃজেলা বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে মঙ্গলবার সকাল থেকে রাজশাহী কার্যত সড়ক যোগাযোগে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, চরম ভোগান্তিতে পড়েন হাজারো যাত্রী।
সোমবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংকট নিরসনের চেষ্টা করা হলেও কোনো সমাধান হয়নি। বৈঠকে শ্রমিকদের একটি অংশ সাধারণ সভার মাধ্যমে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে। তবে জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ সভা আয়োজন নিরাপদ ও বাস্তবসম্মত নয় বলে মত দেন। তিনি প্রশাসন, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন।
কিন্তু এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের একটি অংশ বৈঠক থেকেই বাস চলাচল বন্ধের ঘোষণা দেয়। সোমবার রাত ৮টার পর থেকে রাজশাহী থেকে আন্তঃজেলা বাস চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। রাতের কয়েকটি নির্ধারিত দূরপাল্লার বাস গন্তব্যে গেলেও মঙ্গলবার সকাল থেকে সব ধরনের আন্তঃজেলা বাস চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়।
শ্রমিকদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ইউনিয়নের নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় সংগঠনের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। নির্বাচন পরিচালনার জন্য সাধারণ সভার মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন তারা। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের সর্বশেষ উদ্যোগেও সেই দাবির প্রতিফলন ঘটেনি।
শ্রমিক নেতা মোমিনুল ইসলাম মোমিন অভিযোগ করেন, জেলা প্রশাসক নিরপেক্ষ অবস্থান না নিয়ে একটি পক্ষকে প্রাধান্য দিয়েছেন। সাধারণ সভার দাবি উপেক্ষা করে রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলালকে সম্পৃক্ত করে নির্বাচন পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়ায় তারা ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।
বৈঠক শেষে রাজশাহীর শিরোইল বাস টার্মিনাল এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলালের ব্যক্তিগত চেম্বারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম অভিযোগ নাকচ করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ সভা আয়োজন সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় বিকল্প পদ্ধতিতে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান করে দ্রুত বাস চলাচল স্বাভাবিক করতে প্রশাসন কাজ করছে।
রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলাল বলেন, মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু তার জেরে বাস চলাচল বন্ধ রাখা কিংবা হামলা-ভাঙচুর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মালিকপক্ষ সব সময় বাস চলাচল স্বাভাবিক রাখার পক্ষেই রয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
হঠাৎ করে আন্তঃজেলা বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাজশাহী থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করতে আসা যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেকেই বিকল্প পরিবহনের সন্ধান করছেন, তবে অতিরিক্ত ভাড়া ও সীমিত যানবাহনের কারণে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, রোগী ও শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধ দ্রুত সমাধান না হলে রাজশাহীর পরিবহন খাত আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। এ অবস্থায় প্রশাসন, মালিক ও শ্রমিক নেতাদের মধ্যে নতুন করে সংলাপের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানই অচলাবস্থা কাটানোর একমাত্র পথ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন