ঠাকুরগাঁওয়ে এক স্কুলছাত্রীকে রাস্তা থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণের দায়ে মো. আনিস রানা, মো. সাইফুল ইসলাম ও মো. দুলাল নামে তিন ধর্ষককে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং প্রত্যেককে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। এ ছাড়াও মো. আনিছুর, মো. খতিবুর খতু ও মো. লালু নামে তিন আসামি ধর্ষণে সহায়তা করায় তাদের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে দণ্ডিতদের সম্পত্তি নিলামে বিক্রিরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রোববার (১৯ জুলাই) ঠাকুরগাঁও শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) আলী মনসুর এ রায় ঘোষণা করেন।
আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিতরা হলেন— ঠাকুরগাঁও পৌর শহরের গোয়ালপাড়া মহল্লার ইউনুস কসাইয়ের ছেলে মো. আনিস রানা (৩৫), মুসলিমনগর এলাকার মাইরুদ্দিনের ছেলে সাইফুল ইসলাম (৪০) এবং ভোট কসাইয়ের ছেলে মো. দুলাল (৪৮)।
এ ছাড়াও যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিতরা হলেন— ঠাকুরগাঁও পৌর শহরের মুসলিমনগর এলাকার মো. সেলিমের ছেলে মো. আনিছুর (২৯), বাংরু মোহাম্মদের ছেলে মো. খতিবুর খতু (৩২) এবং বজলুর ছেলে মো. লালু (২৬)।
আদালতের রায় অনুযায়ী, মো. আনিস রানা, মো. সাইফুল ইসলাম ও মো. দুলালকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (সংশোধনী-২০০৩) এর ৯(৩) ধারায় আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং প্রত্যেককে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আদালত আদেশে উল্লেখ করেন, তারা ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫(এ) ধারার সুবিধা কিংবা জেল কোড অনুযায়ী কোনো ধরনের সাজা মওকুফ (রেমিশন) সুবিধা পাবেন না।
অপরদিকে, মো. আনিছুর, মো. খতিবুর খতু ও মো. লালুকে একই আইনের ৯(৩)/৩০ ধারায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড, প্রত্যেককে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫(এ) ধারা অনুযায়ী বিচারাধীন অবস্থায় হাজতে থাকা সময় সাজা থেকে সমন্বয় হবে। তবে তারাও জেল কোড অনুযায়ী রেমিশনের সুবিধা পাবেন না।
মামলার এজাহার ও আদালত থেকে জানা যায়, ২০১১ সালের ২১ অক্টোবর সন্ধ্যায় ১৪ বছর বয়সি এক কিশোরী বান্ধবীর বাড়ি থেকে ফেরার পথে ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় মহাসড়কের পাশে এনামুল পেট্রোল পাম্পের পেছনে পৌঁছলে কয়েকজন যুবক তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। পরে মোবাইল ফোনে আরও কয়েকজনকে ডেকে এনে ভয়ভীতি দেখিয়ে পালাক্রমে তাকে ধর্ষণ করা হয়। এ সময় অপর আসামিরা ধর্ষণে সহযোগিতা করে।
ভুক্তভোগীর চিৎকার শুনে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী এগিয়ে এলে আসামিরা পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তিনি বাড়ি ফিরে পরিবারের সদস্যদের ঘটনাটি জানান। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ঘটনার সময় ভুক্তভোগীর বাবা বাড়িতে না থাকায় কয়েকদিন পর তিনি ফিরে এসে ঘটনার সত্যতা যাচাই করে ২০১১ সালের ২৫ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও সদর থানায় মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচারিক কার্যক্রম শেষে প্রায় ১৫ বছর পর মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।
ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণে সম্পত্তি নিলামের নির্দেশ
রায়ে আদালত বলেছেন, দণ্ডিতদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য হবে। আপিলের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর তাদের সম্পদ থেকে এ অর্থ আদায় করা হবে। বর্তমান সম্পদ থেকে আদায় সম্ভব না হলে ভবিষ্যতে অর্জিত সম্পদ থেকেও ক্ষতিপূরণ আদায় করা যাবে।
এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী দণ্ডিতদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়ার জন্য ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। পরে সেই অর্থ ভুক্তভোগীকে প্রদান করা হবে।
রায় ঘোষণার সময় আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মো. আনিস রানা পলাতক থাকায় আদালত তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আত্মসমর্পণ বা গ্রেপ্তার হওয়ার দিন থেকে তার সাজা কার্যকর হবে।
রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (স্পেশাল পিপি) অ্যাডভোকেট মো. বদিউজ্জামান চৌধুরী বাদল বলেন, এই রায় ন্যায়সঙ্গত হয়েছে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ভিকটিম ন্যায়বিচার পেয়েছে। শিশু ও নারী নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে এই রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন