নিজের বসতভিটায় থেকেও যেন পরবাসী জীবন। রাত নামলেই ঘুম হারাম, দিনের আলোতেও নেই স্বস্তি। যে জমিতে বছরের পর বছর ফসল ফলেছে, সেই জমি হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটছে বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার দড়ি উমাজুড়ী গ্রামের দুই সহোদর বিজয় মণ্ডল ও কৃষ্ণপদ মণ্ডলের।
অভিযোগ উঠেছে, সুদের টাকা নিয়ে তা সম্পূর্ণ শোধ করার পরও ব্লাঙ্ক স্ট্যাম্প দেখিয়ে তাদের কাছে এখন সাত লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বসতঘর ও ঘের দখল এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সম্প্রতি তারা চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযুক্তরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় পরিবারটি চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
ভুক্তভোগী ও অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়, ৯ বছর আগে ঘের ও জমিজমা-সংক্রান্ত কাজে স্থানীয় কয়েকজনের কাছ থেকে তারা তিন লাখ টাকা ধার নেন। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিবছর ৯০ হাজার টাকা করে সুদ দেওয়ার কথা ছিল। বিজয় ও কৃষ্ণপদ মণ্ডলের দাবি, তারা টানা ছয় বছর নিয়মিত সুদের টাকা পরিশোধ করেছেন।
পরে জমি ও ঘের বন্ধক রেখে আসল তিন লাখ টাকাও পরিশোধ করা হয়। কিন্তু এরপরও সুদের অজুহাতে নতুন করে টাকা দাবির শুরু হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রায় ছয় মাস আগে স্থানীয়ভাবে তাদের আটকে রেখে তিনটি স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক সই করিয়ে নেওয়া হয়। এখন সেই স্ট্যাম্প দেখিয়ে সাত লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে। টাকা না দিলে বাড়িঘর ছেড়ে দিতে ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিজয় মণ্ডল বলেন, আমরা সব টাকা শোধ করেছি। তারপরও নতুন করে সাত লাখ টাকা চাওয়া হচ্ছে। টাকা না দিলে ঘরবাড়ি ছেড়ে দিতে বলছে, এমনকি মেরে ফেলার হুমকিও দিচ্ছে। পরিবার নিয়ে আমরা চরম আতঙ্কে আছি।
তার ভাই কৃষ্ণপদ মণ্ডল বলেন, আইন না জানার সুযোগ নিয়ে আমাদের দিয়ে ব্লাঙ্ক স্ট্যাম্পে সই করানো হয়েছে। আমরা কোনো অপরাধ করিনি। তবুও প্রতিদিন হুমকি পাচ্ছি। আমাদের জমি আর জীবন—দুটোই আজ বিপন্ন।
এদিকে গোপাল মণ্ডল বলেন, কৃষ্ণপদ মণ্ডলের জমি তার কাছে বন্ধক ছিল এবং সেই জমি বন্ধক রেখেই সুরেশ বৈরাগীর মাধ্যমে তিন লাখ টাকা দেওয়া হয়।
সুরেশ বৈরাগী দাবি করেন, তিনি শুধু টাকা পৌঁছে দিয়েছেন, নিজে কোনো টাকা রাখেননি।
অন্যদিকে পলাশ হীরা সুদের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি সুদে টাকা দিইনি। জমি বন্ধক রেখে টাকা দেওয়া হয়েছিল। স্ট্যাম্পে তারা স্বেচ্ছায় লিখিত দিয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, যদি সবকিছু স্বেচ্ছায় হয়ে থাকে, তাহলে টাকা শোধের পর নতুন করে সাত লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে কেন? আর ব্লাঙ্ক স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক সই করানোর অভিযোগই বা এলো কীভাবে?
এদিকে পরিবারটির নিরাপত্তা ও জমির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সুদের দৌরাত্ম্য ও প্রভাবশালীর চাপের কাছে সাধারণ মানুষ দিন দিন আরও অসহায় হয়ে পড়ছে।


