প্রযুক্তি আর যন্ত্রচালিত পরিবহনের বিস্তারে বদলে গেছে গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা। তবে সেই পরিবর্তনের মাঝেও বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কিছু এলাকায় এখনো আলু পরিবহনের প্রধান ভরসা ঘোড়ার গাড়ি। শত বছরের এই পদ্ধতি আঁকড়ে ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন শতাধিক মানুষ।
উপজেলার কুসুম্বী ইউনিয়নের তিলকাতলা ভদ্রা নদীপাড় এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, আলু তোলার মৌসুমে জমে উঠেছে কর্মচাঞ্চল্য। মাঠ থেকে ওঠা আলুর বস্তা সারিবদ্ধভাবে তোলা হচ্ছে ঘোড়ার গাড়িতে। কাদা ও পানিপূর্ণ জমি পেরিয়ে এসব আলু পৌঁছানো হচ্ছে পাঁকা সড়কে, সেখান থেকে ট্রাকে করে যাচ্ছে হিমাগার বা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। একই চিত্র দেখা গেছে বোর্ডেরহাট এলাকাতেও।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্তত ছয় থেকে সাত বছর ধরে সংগঠিতভাবে আলু পরিবহনের কাজে যুক্ত রয়েছে কয়েকটি দল। বর্তমানে এ অঞ্চলে প্রায় সাতটি ঘোড়ার গাড়ির দল সক্রিয়।
রাশেদ নামের এক শ্রমিক জানান, তিনি দুই বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত। একটি ঘোড়ার গাড়িতে ১৫ থেকে ১৬ মণ আলু বহন করা যায়। প্রতি ৬৫ কেজির বস্তা পরিবহনে তারা পান ৬০ টাকা। পুরো মৌসুমে তার আয় দাঁড়ায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। এই আয় দিয়েই পরিবার চালান তিনি।
এই পেশায় যুক্তদের অনেকেই স্থানীয় নন। মৌসুম এলেই নাটোরের সিংড়া, পাবনার চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়া, বগুড়ার ধুনট এবং সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও কাজিপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকেরা এখানে এসে কাজ করেন।
শ্রমিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন। আগে ধান মাড়াইয়ে ব্যবহার হতো, এখন আলু বহনে করছি।’ তবে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘ট্রাক–টলির ব্যবহার বাড়ায় এই পেশা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।’
তবে ঘোড়ার গাড়ির কিছু বাস্তব সুবিধাও রয়েছে। কাদা বা পানিপূর্ণ জমিতে যেখানে ট্রাক বা অন্যান্য যানবাহন চলতে পারে না, সেখানে সহজেই চলাচল করতে পারে এই বাহন। কম খরচেও পরিবহন সম্ভব হওয়ায় অনেক কৃষক এখনো এদের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি সাইকেলেও আলু বহনের প্রচলন রয়েছে।
শ্রমিকদের তথ্যমতে, প্রতিটি দল মৌসুমে প্রায় ৫০ হাজার বস্তা আলু পরিবহন করে। একটি ঘোড়ার পেছনে প্রতিদিন খাবার ও পরিচর্যায় খরচ হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। তবুও কম খরচ ও কাজের সুযোগ থাকায় পেশাটি ধরে রেখেছেন তারা।
এদিকে আলুর বাজার পরিস্থিতিও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। মৌসুমের শুরুতে মাঠ থেকেই আলু বিক্রি হয়েছে মাত্র ৬ টাকা কেজি দরে। বর্তমানে তা বেড়ে ১২ থেকে ১৩ টাকায় উঠেছে। এতে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও কৃষকদের অভিযোগ, লাভের বড় অংশই চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আবাদ হয়েছে ২ হাজার ৭৮০ হেক্টরে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫০ হাজার টন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জুলফিকার হায়দার জানান, উপজেলায় পাঁচটি কোল্ড স্টোরেজে মোট ৩৩ হাজার ৬০০ টন আলু সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি অনেক কৃষক স্থানীয় পদ্ধতিতেও আলু সংরক্ষণ করছেন।
গ্রামীণ জীবনের এই বাস্তবতায় ঘোড়ার গাড়ি শুধু একটি পরিবহন মাধ্যম নয়, বরং নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। তবে আধুনিক যন্ত্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী পেশা কতদিন টিকে থাকবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
-20260330103908.webp)

