আষাঢ়-শ্রাবণের টানা বর্ষণে দেশের খাল-বিল, ডোবা-নালা ও প্লাবিত ফসলি জমিতে এখন দেশীয় মাছ ধরার মৌসুম। আর এ মৌসুমে মাছ শিকারের ঐতিহ্যবাহী ও পরিবেশবান্ধব উপকরণ হিসেবে এখনো সমান কদর রয়েছে বাঁশ ও সুতার বুননে তৈরি ‘খলসানি’।
বর্ষা মৌসুমকে ঘিরে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ধাপ হাটে এবারও উঠেছে বিপুল পরিমাণ খলসানি। তবে টানা বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে ভরা মৌসুমে দেখা দিয়েছে ক্রেতা সংকট। এতে প্রত্যাশিত বিক্রি না হওয়ায় হতাশ কারিগররা ও বিক্রেতারা।
রোববার (১২ জুলাই) সকালে সরেজমিনে ধাপহাটে গিয়ে দেখা যায়, হাটজুড়ে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন আকারের খলসানি। প্রতি বছর বর্ষার এ সময়ে দূর-দূরান্ত থেকে পাইকার ও খুচরা ক্রেতাদের ভিড় থাকলেও এবার চিত্র ভিন্ন। কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও অতিবৃষ্টির কারণে ক্রেতার উপস্থিতি ছিল অনেকটাই কম। ফলে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও বেচাকেনা হয়েছে ধীরগতিতে।
একসময় অবৈধ ও মৎস্যসম্পদ ধ্বংসকারী ‘চায়না দুয়ারী’ জালের দাপটে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় পড়েছিল দেশীয় বাঁশশিল্পের এই ঐতিহ্য। তবে পরিবেশ সংরক্ষণ ও দেশীয় মাছের প্রজনন রক্ষায় সচেতনতা বাড়ায় ক্ষতিকর জালের ব্যবহার কমেছে। ফলে পরিবেশবান্ধব মাছ ধরার উপকরণ হিসেবে গ্রামীণ জনপদে এখনো খলসানির চাহিদা রয়েছে।
স্থানীয় কারিগর সুমন বলেন, ‘সারা বছর পরিশ্রম করে বর্ষা মৌসুমের জন্য খলসানি তৈরি করি। এবারও পর্যাপ্ত খলসানি নিয়ে হাটে এসেছি। কিন্তু সকাল থেকেই বৃষ্টি থাকায় ক্রেতা খুবই কম। বিক্রি না হলে উৎপাদন খরচই ওঠানো কঠিন হয়ে যাবে।
খলসানি বিক্রেতা সিদ্দিকুর রহমান জানান, আকার ও মানভেদে ছোট খলসানি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, মাঝারি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং বড় খলসানি ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উন্নত মানের বড় আকৃতির খলসানির দাম ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত। বাঁশের মান, বুননের ঘনত্ব ও কারিগরি দক্ষতার ভিত্তিতে দামে কিছুটা তারতম্য হয়।
ক্রেতা কম থাকায় অনেক বিক্রেতা লাভের আশা ছেড়ে উৎপাদন খরচ তুলতেই কম দামে খলসানি বিক্রি করছেন। পাইকারদের উপস্থিতি কম থাকায় অধিকাংশ বিক্রেতাকে খুচরা ক্রেতাদের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে সাময়িক বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাদের আশা, আবহাওয়া অনুকূলে এলে আগামী হাটগুলোতে ক্রেতার সমাগম বাড়বে। তখন দেশীয় ঐতিহ্যের এই বাঁশশিল্পের বাজারও চাঙা হবে এবং কারিগররা তাদের শ্রমের ন্যায্যমূল্য পাবেন।
স্থানীয়দের মতে, পরিবেশবান্ধব মাছ ধরার উপকরণ হিসেবে খলসানির ব্যবহার বাড়াতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও দেশীয় বাঁশশিল্প সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে শতবর্ষী এ ঐতিহ্য আরও বিকশিত হবে।

